বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৩৩ পূর্বাহ্ন

সংবাদ শিরোনাম :
পুরান ঢাকায় বিজয়া দশমী: আনন্দের মাঝে বিষাদের সুর মর্তুজাবাদ কামিল মাদরাসার ৬০ বছর পূর্তি উপলক্ষে হীরক জয়ন্তী উদযাপনের প্রস্তুতি শিশুদের জটিল সার্জিক্যাল ও ইউরোলজিক্যাল সমস্যায় চিকিৎসা দিচ্ছেন ডা. জি. এম. মোর্শেদ রূপগঞ্জে যুবদল নেতা রিপন হত্যা মামলার আসামি সারোয়ার গ্রেপ্তার ৩৫ বছর পত্রিকা বিক্রি করে মোস্তফার আক্ষেপ ‘আর পারা যাচ্ছে না’ সোনারগাঁওয়ের ঐতিহাসিক স্থাপনা ঘুরে দেখলেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত বন্ধুত্বের টানে রাজধানীতে ‘ফ্রেন্ডস অব ঢাকা নিউমার্কেট ২০০০’-এর পুনর্মিলনী রূপগঞ্জে দাউদপুর ইউনিয়নের ওলামা মাশায়েখদের নিয়ে মতবিনিময় সভা মধ্যরাতে ভারী বৃষ্টিতে পানির নিচে পাতায়া, ডুবল গুরুত্বপূর্ণ সড়ক সাংবাদিকদের ওপর হামলা, ওসির বিরুদ্ধে মামলা না নেওয়ার অভিযোগ
পুরান ঢাকায় বিজয়া দশমী: আনন্দের মাঝে বিষাদের সুর

পুরান ঢাকায় বিজয়া দশমী: আনন্দের মাঝে বিষাদের সুর

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা

ঢাকের বাদ্য, কাঁসর-ঘণ্টার শব্দ আর ভক্তদের উচ্ছ্বাসে মুখর পুরান ঢাকার শাঁখারী বাজার, তাঁতীবাজার ও লক্ষ্মীবাজার। কারও হাতে ফুল, কারও চোখে জল। কেউ ঢাকের তালে নাচছেন, কেউ গানের মধ্য দিয়ে দেবী দুর্গাকে বিদায় জানাচ্ছেন। উৎসবের আনন্দের পাশাপাশি ভক্তদের মনে বাজছে বিষাদের সুর। কারণ, এক বছরের জন্য মর্ত্য ছেড়ে কৈলাসে ফিরে যাচ্ছেন দেবী দুর্গা।

বিজয়া দশমীর রাতে পুরান ঢাকার হিন্দু অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে দেখা যায় এমনই আবেগঘন পরিবেশ। এবারের দুর্গাপূজায় শাঁখারী বাজার, তাঁতীবাজার, লক্ষ্মীবাজারসহ আশপাশের এলাকায় ছিল বাড়তি জাঁকজমক। মণ্ডপে মণ্ডপে মানুষের ভিড়, আলোকসজ্জা, ঢাকের তালে নাচ ও সাংস্কৃতিক আয়োজন ঘিরে উৎসবের দিনগুলো ছিল প্রাণবন্ত। তবে দশমীর রাতে বিদায়ের ক্ষণ ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে আনন্দের আবহে মিশে যায় বিচ্ছেদের বেদনা।

পুরান ঢাকার অলিগলিতে দুর্গাপূজা কেবল ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ নয়। দীর্ঘদিনের সামাজিক বন্ধন, পারিবারিক স্মৃতি ও প্রতিবেশীদের সম্মিলিত অংশগ্রহণ এই উৎসবকে দিয়েছে ভিন্ন মাত্রা। ফলে দেবীকে বিদায় জানানোর মুহূর্তে ভক্তদের মনে ধর্মীয় অনুভূতির পাশাপাশি কাজ করে কয়েক দিনের মিলনমেলা শেষ হওয়ার বেদনাও।

শাঁখারী বাজারের একটি পূজামণ্ডপে উপস্থিত প্রেয়সী চক্রবর্তী বলেন, “সারা বছর আমরা এই দিনগুলোর জন্য অপেক্ষা করি। পূজার সময় আত্মীয়স্বজন, বন্ধু আর পরিচিত মানুষের সঙ্গে দেখা হয়। সবাই মিলে আনন্দ করি। কিন্তু দশমী এলেই মনে হয়, সময়টা এত তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে গেল কেন! দেবীকে বিদায় জানাতে গিয়ে আনন্দের মধ্যেও মনটা খারাপ হয়ে যায়।”

তিনি বলেন, পূজার কয়েকটি দিন পুরান ঢাকার পরিচিত গলিগুলো নতুন রূপ পায়। মণ্ডপে মণ্ডপে মানুষের আনাগোনা, সাজসজ্জা ও সাংস্কৃতিক আয়োজনের মধ্য দিয়ে তৈরি হয় সম্মিলিত আনন্দের পরিবেশ। দশমীর রাতে সেই পরিবেশের মধ্যেই শুরু হয় আগামী বছরের পূজার অপেক্ষা।

তাঁতীবাজার এলাকায় পূজার আয়োজনে অংশ নেওয়া সুনন্দা সাহা বলেন, এবারের পূজায় মানুষের অংশগ্রহণ ও আয়োজন দেখে তাঁর ভালো লেগেছে। সবাই মিলে আনন্দ করা, ঘোরাঘুরি ও পরিচিতজনদের সঙ্গে সময় কাটানোর পর এখন দেবী বিদায়ের সময় এসে আবারও এক বছরের অপেক্ষার কথা মনে হচ্ছে। ঢাকের শব্দ ও মণ্ডপের উৎসবমুখর পরিবেশ খুব মিস করবেন বলেও জানান তিনি।

লক্ষ্মীবাজারের পূজামণ্ডপে উপস্থিত সুপ্রভা দত্ত বলেন, “দেবী দুর্গা আমাদের কাছে শক্তি, সাহস ও আশার প্রতীক। পূজার সময় আমরা সবাই একসঙ্গে আনন্দ করি। দশমীতে তাঁকে বিদায় জানানোর সময় তাই মনটা ভারী হয়ে আসে। তবে এই বিদায়ের মধ্যেই আগামী বছরের পূজার অপেক্ষা শুরু হয়। আমরা চাই, সবাই ভালো থাকুক, সমাজে শান্তি থাকুক, আগামী বছর আরও আনন্দ নিয়ে পূজা করতে পারি।”

দশমীর রাতে পুরান ঢাকার বিভিন্ন পূজামণ্ডপে চলে বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতা। ঢাকের তালে নাচ, শুভেচ্ছা বিনিময় ও প্রতিমা বিসর্জনের প্রস্তুতির মধ্য দিয়ে দেবীকে বিদায় জানান ভক্তরা। অনেকে দেবীর কাছে প্রার্থনা করেন, আগামী বছর যেন আবারও আনন্দ ও শান্তির বার্তা নিয়ে ফিরে আসেন তিনি।

এবারের পূজায় পুরান ঢাকার বিভিন্ন মণ্ডপে ছিল দৃষ্টিনন্দন সাজসজ্জা ও নানা আয়োজন। পূজার দিনগুলোতে পরিবার-পরিজন নিয়ে মণ্ডপে আসেন অনেকে। স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি আশপাশের এলাকার মানুষের উপস্থিতিতে মুখর হয়ে ওঠে বিভিন্ন সড়ক ও অলিগলি। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি উৎসবটি মানুষের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ ও পারস্পরিক সম্প্রীতির বন্ধনও দৃঢ় করেছে।

এদিকে, দুর্গাপূজাকে ঘিরে পুরান ঢাকার সার্বিক নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কে এম রবিউল ইসলাম।

তিনি বলেন, “এ বছর পুরান ঢাকায় দুর্গাপূজা সুন্দরভাবে সম্পন্ন হয়েছে। পূজাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন মণ্ডপে যেন শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় থাকে, সেজন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। পূজার আয়োজক, স্থানীয় বাসিন্দা ও সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতায় সার্বিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, পূজামণ্ডপের অবস্থান, মানুষের চলাচল ও উৎসব ঘিরে জনসমাগম বিবেচনায় নিয়ে নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। আয়োজকদের সঙ্গে সমন্বয় করে ভক্তদের নির্বিঘ্নে পূজার আনুষ্ঠানিকতায় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। সার্বিকভাবে পূজার আয়োজন শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হওয়ায় তাঁরা সন্তুষ্ট।

রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পুরান ঢাকার অলিগলিতে আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে বিদায়ের আবহ। কোথাও ঢাকের তালে নাচ-গান, কোথাও আবেগাপ্লুত ভক্তদের চোখে জল। আনন্দ ও বিষাদের মিশ্র অনুভূতির মধ্য দিয়ে দেবী দুর্গাকে বিদায় জানান তাঁরা।

দেবী চলে যাবেন, একসময় নিভে আসবে মণ্ডপের আলো। পুরান ঢাকায় ফিরে আসবে চেনা ব্যস্ততা। তবে শাঁখারী বাজার, তাঁতীবাজার ও লক্ষ্মীবাজারের বাসিন্দাদের মনে রয়ে যাবে উৎসবের স্মৃতি, প্রিয়জনদের সঙ্গে কাটানো মুহূর্ত আর বিজয়া দশমীর রাতের আবেগ। বিদায়ের মধ্য দিয়েই শুরু হবে আগামী বছরের দুর্গাপূজার অপেক্ষা।





স্বত্ব © ২০২৫ নিউজ ৩৬ এইসডি ।
Design & Developed BY POPCORN IT