কক্সবাজার থেকে ফিরেঃ
বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজারে এখন পর্যটকদের চলাচলে যোগ হয়েছে এক নতুন মাত্রা। শুধু হেঁটে বা ইজিবাইকে ঘুরে বেড়ানোই নয়, পর্যটকদের পছন্দ ও চাহিদার ওপর ভর করে গড়ে উঠেছে শত শত মোটরসাইকেল ও স্কুটার ভাড়ার ব্যবসা। এটি একদিকে যেমন পর্যটকদের ভ্রমণের আনন্দ বাড়িয়ে দিয়েছে, অন্যদিকে স্থানীয় তরুণদের জীবিকা অর্জনের একটি অন্যতম প্রধান মাধ্যমে পরিণত হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, কক্সবাজারের প্রাণকেন্দ্র লাবনী পয়েন্ট, সুগন্ধা পয়েন্ট, ডলফিন মোড়, হোটেল নিসর্গ-এর সামনে এবং কলাতলী মোড়সহ আশপাশের অন্তত শতাধিক স্পটে সারিবদ্ধভাবে সাজিয়ে রাখা হয়েছে আধুনিক বিভিন্ন ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেল। বিশেষ করে তরুণ ও নতুন দম্পতি পর্যটকদের কাছে এই বাইক রাইডিং দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
ভাড়া ও নিয়মকানুন
ঘণ্টাপ্রতি ২০০ টাকা থেকে ৫০০ টাকার বিনিময়ে এসব বাইক ও স্কুটার ভাড়া পাওয়া যাচ্ছে। চাহিদামতো মোটরসাইকেলের মডেল ও ব্র্যান্ড ভেদে ভাড়ার পরিমাণে তারতম্য হয়ে থাকে। পর্যটকরা খুব সহজেই নিজেদের এনআইডি (NID) বা ড্রাইভিং লাইসেন্স এবং নির্দিষ্ট নিবন্ধন ফরম পূরণ করে ঘণ্টার হিসেবে এসব মোটরসাইকেল শহরের মেরিন ড্রাইভ বা অন্যান্য দর্শনীয় স্থান ভ্রমণের জন্য নিয়ে যেতে পারছেন।
উদ্যোক্তা ও মালিকদের বক্তব্য
কক্স রেন্ট বাইক’-এর স্বত্বাধিকারী মিরাজ বলেন, “পর্যটকরা এখন আর গতানুগতিক উপায়ে ঘুরতে চান না; তারা স্বাধীনভাবে মেরিন ড্রাইভ বা সৈকতের আশপাশে ঘুরে বেড়ানোর আনন্দ উপভোগ করতে চান। আমাদের এখানে ২০০ থেকে ৫০০ টাকা ঘণ্টার হিসেবে বাইক দেওয়া হয়। পর্যটকরা তাদের পছন্দমতো বাইক নিয়ে নিরাপদে ঘুরে বেড়াতে পারেন। এতে তাদের সময় ও খরচ—দুটিই সাশ্রয় হয়।
এই ব্যবসার সাথে জড়িত অপর এক বাইক রেন্টাল মালিক জুয়েল জানান, “সিজন এবং অফ-সিজন মিলিয়ে আমাদের এই বাইক ভাড়ার ব্যবসা দিয়েই পুরো পরিবারের জীবিকা নির্বাহ হয়। প্রতিদিন যে আয় হয়, তা দিয়ে আমাদের সংসার ও বাইকের রক্ষণাবেক্ষণের খরচ বেশ ভালোভাবে চলে যায়।”
আরেক রেন্ট বাইক মালিক সামসুল আলম বলেন, “বেকারত্ব দূরীকরণে এই ব্যবসা কক্সবাজারের যুবকদের জন্য বড় একটা সুযোগ তৈরি করেছে। পর্যটকদের সেবাদানের পাশাপাশি আমরা এখান থেকে সৎভাবে আয় করে নিজেদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করছি।
অভিযোগ ও ভোগান্তির চিত্র
তবে ইতিবাচক দিকগুলোর পাশাপাশি কিছু কিছু রেন্টাল মালিকের বিরুদ্ধে হয়রানি ও অতিরিক্ত টাকা আদায়ের অভিযোগও তুলেছেন দূর-দূরান্ত থেকে আসা পর্যটকরা।
ঢাকা থেকে আসা পর্যটক কামাল হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, সামান্য দুর্ঘটনায় বাইকের লিভার ভেঙে গেলে তিনি ৪০০ টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে চান। কিন্তু বাইক মালিক জোরপূর্বক তার কাছ থেকে ২,০০০ টাকা আদায় করেন।
অন্যদিকে নারায়ণগঞ্জ থেকে আসা আরেক পর্যটক বিল্লাল হোসেন অভিযোগ করেন, মেরিন ড্রাইভে যাওয়ার সময় বাইক মালিক ২ লিটার তেল আছে বলে দাবি করেছিলেন। কিন্তু মাঝপথে হঠাৎ তেল শেষ হয়ে গেলে চরম ভোগান্তিতে পড়েন তিনি। পরবর্তীতে নির্ধারিত এক ঘণ্টার চেয়ে বেশি সময় পার হওয়ায় বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত টাকা গুণতে হয় তাকে।
নিরাপত্তা ও সুশাসনের দাবি
সংশ্লিষ্ট সচেতন মহল মনে করছেন, সমুদ্রসৈকতসংলগ্ন সড়ক ও মেরিন ড্রাইভে বাইক চালানোর সময় যেমন হেলমেট পরিধান ও সাবধানতা প্রয়োজন, তেমনি পর্যটকদের সুবিধার্থে এই ব্যবসাটিকে সুনির্দিষ্ট নীতিমালার আওতায় আনা দরকার। এতে একদিকে দুর্ঘটনা ও হয়রানি কমবে, অন্যদিকে পর্যটকরা আরও স্বাচ্ছন্দ্যে কক্সবাজার ভ্রমণ করতে পারবেন।