বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬, ০৪:৫৬ অপরাহ্ন

সংবাদ শিরোনাম :
নরসিংদীর নাছিমা কাদের মোল্লা হাই স্কুলে শতভাগ জিপিএ-৫, সাফল্যের নেপথ্যে কঠোর নিয়ম! থাইল্যান্ডে শুটিং শেষে পাহাড় থেকে নামার পথে দুর্ঘটনা, আহত খায়রুল বাসার আটকে গেল ৭ লাখ শিক্ষার্থী- এসএসসি ফলাফলে শহর-গ্রামের বৈষম্য সালমান শাহ হত্যা: ৩০ বছর পরও ১০ প্রশ্নের উত্তর মেলেনি রূপগঞ্জে এসএসসির ফলাফলে পাসের হার ৭৭.৭৯ শতাংশ, জিপিএ-৫ পেয়েছে ২৪৫ রূপগঞ্জে পরিবেশ উন্নয়নে অভিযান, গাছের চারা রোপন, বিতরণ ও আলোচনা সভা স্বৈরাচারী সরকারের মদতে খাল বেদখল ও ভরাট হয়ে গেছে: পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী মুড সুইং নিয়ে বদলে গেছে বিজ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গি রূপগঞ্জে রনি ডাইংয়ের দূষণে বিপর্যস্ত জনজীবন রূপগঞ্জ সদর ইউনিয়ন পরিষদের নতুন প্রশাসক নূর নবী ভূঁইয়াকে সংবর্ধনা প্রদান
আটকে গেল ৭ লাখ শিক্ষার্থী- এসএসসি ফলাফলে শহর-গ্রামের বৈষম্য

আটকে গেল ৭ লাখ শিক্ষার্থী- এসএসসি ফলাফলে শহর-গ্রামের বৈষম্য

নিজস্ব প্রতিবেদক:
এবারের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার নানা দুর্বলতা নতুন করে সামনে এনেছে। শহরের নামী ও প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে তুলনামূলক ভালো ফল হলেও গ্রাম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের অনেক স্কুল-মাদ্রাসায় দেখা দিয়েছে বড় ধরনের বিপর্যয়। সারাদেশে প্রায় ৭ লাখ শিক্ষার্থী এবার উত্তীর্ণ হতে পারেনি। এতে শুধু শিক্ষার্থীদের ফলাফল নয়, শহর ও গ্রামের শিক্ষার সুযোগ ও মানের বৈষম্য নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
এবার এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় মোট ১৮ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৫ জন পরীক্ষার্থী অংশ নেয়। তাদের মধ্যে পাস করেছে ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ। গত বছরের তুলনায় পাসের হার কমেছে ৬ দশমিক ২০ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ জন, যা গত বছরের তুলনায় ২২ হাজার ৩৫৬ জন কম।
ফলাফলের এই চিত্রকে গত ১৯ বছরের মধ্যে অন্যতম খারাপ ফল হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে ইংরেজি ও গণিত বিষয়ে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা এবারের ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলেছে।
গ্রামেই বেশি বিপর্যয়
এবারের ফলাফলের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিকগুলোর একটি হলো—দেশের ৩১২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে কোনো শিক্ষার্থীই পাস করতে পারেনি। এর মধ্যে ২২৬টি মাদ্রাসা।
শিক্ষাবিদদের মতে, এসব প্রতিষ্ঠানের বড় অংশ গ্রাম ও প্রত্যন্ত এলাকায় হওয়ায় গ্রামীণ শিক্ষাব্যবস্থার বাস্তব চিত্রটি এবার স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। শহরের শিক্ষার্থীরা যেখানে দক্ষ শিক্ষক, কোচিং, প্রযুক্তি, লাইব্রেরি ও নানা ধরনের অতিরিক্ত শিক্ষাসুবিধা পাচ্ছে, সেখানে গ্রামের অনেক শিক্ষার্থী এখনো প্রয়োজনীয় শিক্ষক ও শিক্ষা উপকরণের সংকটে রয়েছে।
বিশেষ করে ইংরেজি ও গণিতের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দক্ষ শিক্ষক সংকট গ্রামীণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর দীর্ঘদিনের সমস্যা। কোথাও কোথাও একটি বিষয়ের শিক্ষক দিয়ে অন্য বিষয় পড়ানোর ঘটনাও রয়েছে। ফলে শিক্ষার্থীদের মৌলিক ধারণা দুর্বল থেকে যাচ্ছে।
মানবিক বিভাগে বড় ধাক্কা
এবারের ফলাফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীরা। বিজ্ঞান বিভাগে পাসের হার যেখানে ৮০ দশমিক ৬৪ শতাংশ, সেখানে মানবিক বিভাগে পাসের হার মাত্র ৪৮ দশমিক ৭৪ শতাংশ।
অর্থাৎ মানবিক বিভাগের অর্ধেকেরও বেশি শিক্ষার্থী এবার উত্তীর্ণ হতে পারেনি। ইংরেজি ও গণিতের মতো বিষয়ে দুর্বলতা এবং নিয়মিত পাঠদানের ঘাটতিকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ডের ফলাফল বিশ্লেষণেও ইংরেজি বিষয়ে দুর্বলতার চিত্র উঠে এসেছে। ময়মনসিংহ বোর্ডে ইংরেজিতে পাসের হার ছিল ৬৬ দশমিক ৬৪ শতাংশ। সিলেট ও বরিশাল বোর্ডেও এ বিষয়ে পাসের হার ছিল প্রায় ৬৯ শতাংশ।
করোনার শিখনঘাটতির প্রভাব
এবার যারা এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে, তাদের শিক্ষাজীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি সময় কেটেছে করোনাভাইরাস মহামারির মধ্যে। দীর্ঘ সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় শ্রেণিকক্ষে নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত হয়। এতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে তৈরি হয় বড় ধরনের শিখনঘাটতি।
করোনার পর স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রমে ফিরলেও অনেক শিক্ষার্থী সেই ঘাটতি পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি। বিশেষ করে গণিত, ইংরেজি ও বিজ্ঞানের মতো ধারাবাহিক অনুশীলননির্ভর বিষয়ে এর প্রভাব বেশি পড়েছে বলে মনে করছেন শিক্ষকরা।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শিক্ষাক্রম পরিবর্তনের বিষয়টি। ২০২৪ সালে নবম শ্রেণিতে ওঠার পর শিক্ষার্থীরা নতুন শিক্ষাক্রমের বই পেলেও পরবর্তী সময়ে আবার ২০১২ সালের শিক্ষাক্রমে ফিরে যাওয়া হয়। একই ব্যাচের শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনে এমন পরিবর্তন তাদের পড়াশোনায় বিভ্রান্তি তৈরি করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এবার মূল্যায়নেও ছিল কঠোরতা
এবারের ফলাফল এতটা খারাপ হওয়ার পেছনে খাতা মূল্যায়নের পদ্ধতিও আলোচনায় এসেছে। বোর্ড কর্মকর্তা ও শিক্ষকরা বলছেন, এবার খাতা মূল্যায়নে অতিরিক্ত নম্বর দেওয়ার কোনো সুযোগ রাখা হয়নি। পরীক্ষকদের তুলনামূলক কমসংখ্যক খাতা দেওয়া হয়েছে এবং মূল্যায়নের জন্যও পর্যাপ্ত সময় দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া পরীক্ষা কেন্দ্রে সিসিটিভি নজরদারি, নকলবিরোধী কঠোর ব্যবস্থা এবং কেন্দ্র ব্যবস্থাপনায় কড়াকড়ির কারণে পরীক্ষার্থীদের অসদুপায় অবলম্বনের সুযোগও ছিল সীমিত।
ফলে আগের বছরগুলোর তুলনায় এবার প্রকৃত মূল্যায়নের মাধ্যমে ফলাফল প্রকাশ পেয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শুধু শিক্ষার্থীদের দায়ী করলে হবে না
শিক্ষাবিদদের মতে, প্রায় ৭ লাখ শিক্ষার্থী পাস করতে না পারার ঘটনাকে শুধু শিক্ষার্থীদের ব্যর্থতা হিসেবে দেখলে সমস্যার প্রকৃত কারণ আড়ালে থেকে যাবে। কেন এত শিক্ষার্থী ইংরেজি ও গণিতে দুর্বল হয়ে পড়ল, কেন গ্রামীণ প্রতিষ্ঠানে পাসের হার এত কম—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা জরুরি।
বিশেষ করে শূন্য পাস করা ৩১২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিয়ে পৃথকভাবে গবেষণা ও তদন্ত করা প্রয়োজন। এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকসংখ্যা, শিক্ষকদের যোগ্যতা, নিয়মিত পাঠদান, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি, অবকাঠামো এবং ব্যবস্থাপনা—সবকিছু খতিয়ে দেখা দরকার।
সমাধান কোথায়?
শিক্ষাবিদদের পরামর্শ, দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য নিয়মিত রেমিডিয়াল বা বিশেষ ক্লাস চালু করতে হবে। গ্রামীণ এলাকায় ইংরেজি ও গণিতের দক্ষ শিক্ষক নিয়োগের পাশাপাশি শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।
একই সঙ্গে শূন্য পাস করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বিশেষ তদারকি, নিয়মিত একাডেমিক অডিট এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নিশ্চিত করতে হবে।
কারণ পাসের হার কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে শিক্ষাব্যবস্থার সফলতা দেখানো গেলেও শিক্ষার্থীদের প্রকৃত জ্ঞান ও দক্ষতার ঘাটতি দূর হবে না। এবারের ফলাফল তাই শুধু একটি পরীক্ষার ফল নয়; বরং দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার ভেতরে থাকা দীর্ঘদিনের বৈষম্য ও দুর্বলতার একটি বড় সতর্কবার্তা।
শহর ও গ্রামের শিক্ষার্থীদের জন্য সমান সুযোগ, দক্ষ শিক্ষক এবং মানসম্মত পাঠদান নিশ্চিত করতে না পারলে ভবিষ্যতেও এমন ফল বিপর্যয়ের আশঙ্কা থেকেই যাবে।





স্বত্ব © ২০২৫ নিউজ ৩৬ এইসডি ।
Design & Developed BY POPCORN IT