স্বাস্থ্য ডেস্ক
বাংলাদেশসহ উপমহাদেশের ঘরে ঘরে যুগ যুগ ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে একটি পরিচিত ভেষজ উদ্ভিদ — চিরতা। স্বাদে এটি অত্যন্ত তিক্ত হলেও শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা নিরাময়ে এর ব্যবহার চলে আসছে অকৃত্রিম ভরসায়।
পুষ্টিবিদদের ভাষায়, চিরতা যেন প্রকৃতির পক্ষ থেকে মানুষের জন্য এক বিশেষ উপহার। হজমের সমস্যা, জ্বর, ত্বকের রোগ কিংবা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে চিরতা দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে বলে জানান বিশেষজ্ঞরা। এটি কাঁচা ও শুকনো — দুই অবস্থাতেই ব্যবহারযোগ্য।
চিরতার ভেতরে লুকিয়ে আছে একাধিক শক্তিশালী প্রাকৃতিক যৌগ। এর মধ্যে রয়েছে এমন একটি উপাদান, যা পৃথিবীর সবচেয়ে তিক্ত যৌগগুলোর একটি বলে পরিচিত। পাশাপাশি রয়েছে গ্লুকোসাইডসজাতীয় উপাদান এবং আয়রন, ক্যালসিয়াম, ম্যাঙ্গানিজের মতো জরুরি খনিজ পদার্থ।
জ্বর ঠেকাতে চিরতার ভূমিকা
গরমকাল কিংবা বর্ষায় জ্বর-সংক্রমণের প্রকোপ বাড়লে চিরতার কদর বেড়ে যায় বহুগুণে। এর মধ্যে থাকা প্রদাহনাশক ও জীবাণুনাশক গুণাগুণ টাইফয়েড, ম্যালেরিয়া কিংবা সাধারণ ভাইরাল জ্বরের সময় শরীরকে স্বস্তি দিতে সহায়ক।
ডায়াবেটিস ও রোগ প্রতিরোধে সহায়ক
চিরতা রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে এবং ইনসুলিন সংবেদনশীলতা বাড়িয়ে টাইপ-২ ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য বিশেষ উপকারী বলে জানা যায়। এছাড়া চিরতায় থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও ফাইটোকেমিক্যাল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে ভাইরাস-ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে শরীরকে প্রস্তুত রাখতে সহায়ক।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, কিছুটা চিরতা পানিতে পাঁচ থেকে সাত মিনিট ফুটিয়ে ঠান্ডা করে দিনে এক থেকে দুইবার পান করা যেতে পারে। কেউ কেউ চিরতা পাতার রসও পান করে থাকেন, তবে অতিরিক্ত তিক্ততার কারণে এতে সামান্য মধু মিশিয়ে নেওয়া যেতে পারে। সবচেয়ে ভালো ফল পেতে চিরতার গুঁড়ো কুসুম গরম পানিতে মিশিয়ে খাওয়ার পরামর্শও দেন কেউ কেউ।
তবে যেকোনো প্রাকৃতিক উপাদানের মতোই চিরতা সেবনেও সংযম জরুরি। বিশেষজ্ঞরা নিম্নলিখিত বিষয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন —
অতিরিক্ত সেবনে পানিশূন্যতা: চিরতায় থাকা অ্যালকালয়েড উপাদানের কারণে বেশি মাত্রায় খেলে শরীরে পানিশূন্যতা দেখা দিতে পারে, যা কিডনির ওপর বাড়তি চাপ ফেলতে পারে।
বমিভাব ও পিত্তজনিত সমস্যা: চিরতা পিত্তরস নিঃসরণ বাড়িয়ে দেয় বলে হজমে সহায়ক হলেও অতিরিক্ত খেলে বমি বমি ভাব বা পিত্তজনিত অস্বস্তি দেখা দিতে পারে।
নিম্ন রক্তচাপের রোগীদের সতর্কতা: চিরতা রক্তচাপ কমাতে সহায়ক হওয়ায় যাদের রক্তচাপ এমনিতেই কম, তাদের সতর্কতার সঙ্গে সেবন করা উচিত।
গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী মায়েরা: চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এই সময় চিরতা সেবন না করাই নিরাপদ।
দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারে সতর্কতা: টানা দীর্ঘদিন ধরে বা প্রয়োজনের বেশি মাত্রায় সেবন করলে শরীরে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নির্দিষ্ট নিয়ম ও পরিমিত মাত্রা মেনে চিরতা সেবন করলেই এর প্রকৃত উপকারিতা মেলে। তাড়াহুড়ো করে বা অতিরিক্ত মাত্রায় সেবন করার আগে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেয়া ভালো।