ডেস্ক রিপোর্ট:
একসময় নারীদের হঠাৎ রাগ, কান্না, বিষণ্নতা, উদ্বেগ কিংবা আচরণগত পরিবর্তনকে ‘হিস্টেরিয়া’ নামে একটি রহস্যময় রোগ হিসেবে দেখা হতো। চিকিৎসাবিজ্ঞানের সীমিত জ্ঞানের কারণে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বহু দেশে উনিশ ও বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে নারীদের মানসিক সমস্যার সঠিক কারণ নির্ণয় করা সম্ভব হয়নি। তবে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান আজ সেই ধারণাকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে ‘মুড সুইং’ কোনো একক রোগ নয়; বরং এটি বিভিন্ন শারীরিক বা মানসিক অবস্থার একটি উপসর্গ হতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে মেজাজের অস্বাভাবিক ওঠানামা হলে তা বিষণ্নতা (Depression), উদ্বেগজনিত সমস্যা (Anxiety Disorder), বাইপোলার ডিসঅর্ডার (Bipolar Disorder), হরমোনজনিত পরিবর্তন, থাইরয়েডের সমস্যা কিংবা অতিরিক্ত মানসিক চাপের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
অতীতে কীভাবে দেখা হতো?
ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, ১৮ ও ১৯ শতকে অনেক চিকিৎসক বিশ্বাস করতেন, নারীদের আবেগপ্রবণতা বা আচরণগত পরিবর্তনের পেছনে তথাকথিত ‘হিস্টেরিয়া’ কাজ করে। সেই সময় বিষণ্নতা, উদ্বেগ, অতিরিক্ত কান্না, রাগ বা মানসিক অস্থিরতার মতো বিভিন্ন উপসর্গকে একই রোগের আওতায় ফেলা হতো।
চিকিৎসা হিসেবে অনেককে দীর্ঘ সময় বিশ্রামে রাখা, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করা, বিভিন্ন ধরনের ওষুধ প্রয়োগ, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ-চিকিৎসার প্রাথমিক পদ্ধতিও ব্যবহার করা হতো। তবে বর্তমান চিকিৎসাবিজ্ঞান এসব পদ্ধতির অনেকগুলোকেই অকার্যকর, বৈজ্ঞানিকভাবে দুর্বল বা কিছু ক্ষেত্রে ক্ষতিকর বলে মনে করে।
আধুনিক বিজ্ঞান কী বলছে?
বিশ শতকের মাঝামাঝি থেকে মনোরোগবিদ্যা ও স্নায়ুবিজ্ঞানের দ্রুত অগ্রগতির ফলে গবেষকেরা বুঝতে পারেন, মানসিক রোগের সঙ্গে মস্তিষ্কের কার্যক্রম, রাসায়নিক বার্তাবাহক, বংশগত বৈশিষ্ট্য, হরমোন, জীবনযাত্রা এবং সামাজিক পরিবেশের গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
এ কারণে বর্তমানে ‘হিস্টেরিয়া’ শব্দটি আধুনিক রোগ নির্ণয়ের তালিকায় ব্যবহার করা হয় না। এর পরিবর্তে রোগীর উপসর্গ অনুযায়ী নির্দিষ্ট রোগ শনাক্ত করে চিকিৎসা দেওয়া হয়।
বর্তমান চিকিৎসা কী?
বর্তমানে চিকিৎসকেরা রোগীর শারীরিক ও মানসিক অবস্থা মূল্যায়ন করে চিকিৎসা পরিকল্পনা তৈরি করেন। এর মধ্যে থাকতে পারে—
কাউন্সেলিং
কগনিটিভ বিহেভিয়ার থেরাপি (CBT)
অন্যান্য মনোচিকিৎসা
প্রয়োজন অনুযায়ী ওষুধ
নিয়মিত ঘুম, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও ব্যায়াম
মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবার-বন্ধুদের সহযোগিতা
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব পদ্ধতির কার্যকারিতা বৈজ্ঞানিক গবেষণার মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
চিকিৎসকদের পরামর্শ, যদি মুড সুইং দীর্ঘদিন স্থায়ী হয়, দৈনন্দিন জীবন, পারিবারিক সম্পর্ক বা কর্মক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, অথবা এর সঙ্গে আত্মহানির চিন্তা, তীব্র হতাশা বা অস্বাভাবিক আচরণ যুক্ত হয়, তাহলে দ্রুত মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
বিশেষজ্ঞদের বার্তা
মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, মানসিক অসুস্থতা লজ্জার বিষয় নয় এবং এটি ব্যক্তিগত দুর্বলতারও পরিচয় নয়। শারীরিক রোগের মতো মানসিক সমস্যারও বৈজ্ঞানিক চিকিৎসা রয়েছে। সময়মতো সঠিক চিকিৎসা ও সামাজিক সহায়তা পেলে অধিকাংশ মানুষই সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন।
ইতিহাসের শিক্ষা হলো—চিকিৎসাবিজ্ঞান সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়। অতীতের ভুল ধারণা ও সীমাবদ্ধতা থেকে শিক্ষা নিয়ে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান এখন প্রমাণভিত্তিক ও নিরাপদ পদ্ধতিতে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করছে।#@#