নিজস্ব প্রতিবেদক:
রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে পদ্মা নদীতে যাত্রীবাহী বাস ডুবে যাওয়ার ঘটনায় এখনো নিখোঁজের সংখ্যা, উদ্ধার তৎপরতা ও প্রকৃত যাত্রীসংখ্যা নিয়ে ধোঁয়াশা কাটেনি।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এ ঘটনায় অন্তত ২৫ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। তবে বাসটিতে প্রায় ৫০ জন যাত্রী ছিলেন বলে জানিয়েছে পুলিশ, ফলে এখনও কয়েকজন নিখোঁজ থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বুধবার বিকেল সোয়া ৫টার দিকে দৌলতদিয়া ফেরিঘাটের ৩ নম্বর পন্টুন এলাকায় এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে।
কুষ্টিয়া থেকে ঢাকাগামী সৌহার্দ্য পরিবহন এর একটি যাত্রীবাহী বাস ফেরিতে ওঠার সময় হঠাৎ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সরাসরি পদ্মা নদীতে পড়ে যায়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ফেরিতে ওঠার সময় বাসটির গতি স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি ছিল। পন্টুনে উঠতে গিয়ে চালক নিয়ন্ত্রণ হারালে মুহূর্তের মধ্যে বাসটি নদীতে তলিয়ে যায়। ঘটনাস্থলে তখনই চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু হয়
রাজবাড়ী জেলা পুলিশের একাধিক সূত্র জানায়, বাসটিতে আনুমানিক ৪৫ থেকে ৫০ জন যাত্রী ছিলেন। তবে সুনির্দিষ্ট তালিকা না থাকায় প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। ফেরিতে ওঠার আগে অনেক যাত্রী দাঁড়িয়ে ছিলেন বলেও জানা গেছে, যা দুর্ঘটনার সময় হতাহতের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়। উদ্ধার তৎপরতা: রাতভর অভিযান দুর্ঘটনার পরপরই স্থানীয় জেলে, ঘাটকর্মী ও ফায়ার সার্ভিস সদস্যরা উদ্ধারকাজ শুরু করেন। রাতেই উদ্ধারকারী যান ‘হামজা’র ক্রেন ব্যবহার করে নদীর তলদেশ থেকে বাসটি তোলা হয়। বাসটি উদ্ধারের পর একে একে মরদেহ বের করা হলে নিহতের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে।
সর্বশেষ হিসেবে ২৫ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এদিকে, দুর্ঘটনার শুরুতেই স্থানীয়রা নদী থেকে দুই নারীকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক তাদের মৃত ঘোষণা করেন। নিখোঁজ কতজন বাসে থাকা সম্ভাব্য যাত্রীর সংখ্যা (প্রায় ৫০) এবং উদ্ধার হওয়া মরদেহ (২৫) বিবেচনায় এখনও অন্তত ২০ থেকে ২৫ জনের ভাগ্য অনিশ্চিত বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, কিছু যাত্রী সাঁতরে তীরে উঠতে সক্ষম হয়েছেন। ফলে নিখোঁজের প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণে সময় লাগছে।
স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, এখনো নিখোঁজের সুনির্দিষ্ট তালিকা প্রস্তুতের কাজ চলছে। যারা নদী থেকে জীবিত উদ্ধার হন প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, কয়েকজন যাত্রী নিজ উদ্যোগে সাঁতরে তীরে উঠতে পেরেছেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা নিয়েছেন এবং পরিচয় গোপন রেখেই বাড়ি ফিরে গেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে সরকারি হিসেবে এখনো জীবিত উদ্ধার হওয়া যাত্রীর নির্দিষ্ট সংখ্যা প্রকাশ করা হয়নি। শনাক্ত হওয়া কয়েকজনের পরিচয় উদ্ধার হওয়া মরদেহের মধ্যে ২১ জনের পরিচয় নিশ্চিত করে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন হলেন— রেহেনা আক্তার (৬১), রাজবাড়ী মর্জিনা খাতুন (৫৬), কুষ্টিয়া রাজীব বিশ্বাস (২৮), কুষ্টিয়া জহুরা আক্তার (২৭), রাজবাড়ী কাজী সাইফ (৩০), রাজবাড়ী আরমান খান (৩১), বাসের চালক সাফিয়া আক্তার রিন্থি (১২), রাজবাড়ী ফাইজ শাহানূর (১১), রাজবাড়ী আয়েশা আক্তার সুমা (৩০), ঢাকা (আশুলিয়া) আহনাফ তাহমিদ খান (২৫), রাজবাড়ী এদের মধ্যে নারী ও শিশুর সংখ্যাই বেশি, যা এই দুর্ঘটনাকে আরও বেদনাদায়ক করে তুলেছে।
স্বজনদের অপেক্ষা ও আহাজারি রাজবাড়ী সদর হাসপাতাল ও দৌলতদিয়া ঘাট এলাকায় স্বজনদের কান্নায় হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
নিখোঁজ এক যাত্রীর স্বজন বলেন, আমরা এখনো জানি না সে বেঁচে আছে না মারা গেছে। নদীর দিকে তাকিয়ে আছি, যদি কোনো খবর পাই। আরেকজন বলেন, লাশ পেলেও একটা সান্ত্বনা থাকে। কিন্তু নিখোঁজ থাকলে সেই কষ্টটা আরও বেশি।
দুর্ঘটনার সম্ভাব্য কারণ প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে— ফেরিতে ওঠার সময় অতিরিক্ত গতি পন্টুনে সঠিক গাইডলাইনের অভাব চালকের নিয়ন্ত্রণ হারানো এসব কারণ মিলেই দুর্ঘটনাটি ঘটেছে।
ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। তদন্ত কমিটি ও প্রশাসনের বক্তব্য ঘটনার পরপরই দুইটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। রাজবাড়ী জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে কাজ করছে কমিটি। একই সঙ্গে নিখোঁজদের সন্ধানে উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রাখা হয়েছে। পুনরাবৃত্তির শঙ্কা দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে এর আগেও একাধিক দুর্ঘটনা ঘটেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঘাটের অব্যবস্থাপনা, যানবাহনের চাপ এবং নিরাপত্তা ঘাটতির কারণে এই ধরনের দুর্ঘটনা বারবার ঘটছে। যথাযথ ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতেও এমন দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা রয়েছে।
দৌলতদিয়া ফেরিঘাটের এই বাসডুবির ঘটনা শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়—এটি দেশের নৌ-যোগাযোগ ব্যবস্থার একটি বড় সতর্কবার্তা। নিখোঁজদের খোঁজে এখনও অপেক্ষা করছেন স্বজনরা। কেউ ফিরে আসবেন জীবিত, নাকি মিলবে নিথর দেহ—এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই কাটছে তাদের প্রতিটি মুহূর্ত।