বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬, ০৩:১৭ অপরাহ্ন

সংবাদ শিরোনাম :
হুইলচেয়ার পেয়ে নতুন জীবন বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুর শৈত্যপ্রবাহে কাঁপছে রূপগঞ্জ: খড়কুটো জ্বালিয়ে উষ্ণতা খুঁজছেন সংবাদকর্মী ও সাধারণ মানুষ ২০২৫-এর শেষে দাঁড়িয়ে ২০২৬: আমরা কেমন বাংলাদেশ চাই নারায়ণগঞ্জে মনোনয়ন জমা শেষ: পাঁচ আসনে ৫৭ প্রার্থী রাষ্ট্রীয় শোকের কারণে ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার উদ্বোধন পেছাল, নতুন তারিখ ৩ জানুয়ারি বেগম খালেদা জিয়ার দাফন উপলক্ষে রাজধানীতে কঠোর ট্রাফিক ব্যবস্থা, বন্ধ থাকবে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সড়ক খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শেখ হাসিনার শোক খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও নেতাদের শোক জামালপুরে ১১০ বোতল ভারতীয় মদ জব্দ, আটক ১ রূপগঞ্জে বিএনপি প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমান ভূইয়ার মনোনয়নপত্র জমা
বিক্রি মন্দা রূপগঞ্জের জামদানি পল্লিতে সারা বছর কাজের চাপ, তবু মন খারাপ বিক্রেতাদের

বিক্রি মন্দা রূপগঞ্জের জামদানি পল্লিতে সারা বছর কাজের চাপ, তবু মন খারাপ বিক্রেতাদের

বিশেষ প্রতিবেদকঃ

ছুটির দিনেও তাঁতের শব্দে মুখর রূপগঞ্জের নোয়াপাড়া গ্রামের বিসিক জামদানি শিল্পনগরী। সকাল থেকেই কারিগরদের ব্যস্ততা চোখে পড়ে। তাঁতের নিচে বসে একনাগাড়ে সুতো টেনে যাচ্ছেন তাঁতীরা— কেউ নকশায় মগ্ন, কেউ রঙ মেলাচ্ছেন হাতে। কারও মুখে ক্লান্তি নেই, কিন্তু দোকানিদের মুখে অস্বস্তির ছাপ স্পষ্ট। তাঁতের চাকাগুলো ঘুরছে, কিন্তু বিক্রির চাকা থমকে আছে।

রাজধানী ঢাকা থেকে মাত্র ৩০ কিলোমিটার দূরে, নারায়ণগঞ্জের  রূপগঞ্জ উপজেলার তারাব পৌরসভার নোয়াপাড়া শীতলক্ষ্যার তীরে গড়ে ওঠা এই শিল্পনগরী স্থানীয়দের কাছে পরিচিত ‘জামদানি পল্লি’ নামে। ঢাকাই মসলিনের ঐতিহ্য থেকেই এর শেকড়। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে সরকারি উদ্যোগে ২০ একর জমির ওপর এই শিল্পনগরীর কার্যক্রম শুরু হয়। বর্তমানে এখানে ৪০৭টি প্লট রয়েছে, প্রতি প্লটে গড়ে চারটি তাঁত— সব মিলিয়ে প্রায় ১,৬০০ তাঁতী প্রতিদিনই জামদানি শাড়ি বুনছেন।

হাটে নেই ক্রেতা

প্রতি শুক্রবার সকালে জামদানি পল্লিতে বসে বড় হাট। দেশের নানা প্রান্ত থেকে পাইকারি ও খুচরা ক্রেতারা এখানে আসেন শাড়ি কিনতে। তবে সাম্প্রতিক শুক্রবারের সকালটা ছিল ভিন্ন। সকাল আটটার মধ্যেই হাট ফাঁকা হয়ে যায়। নয়টার দিকে মাত্র তিনজন বিক্রেতাকে দেখা গেলো পণ্যের গাদা সামনে বসে থাকতে।

হাট কমিটির সদস্য কামরুল হাসান বলেন, “অন্যান্য সময় এই হাটে পা ফেলার জায়গা পাওয়া যায় না। কিন্তু এখন ক্রেতা আসছে না বললেই চলে। এমন সময় আগে কখনো দেখি নাই।”

দোকান ভরা শাড়ি, কিন্তু নেই ক্রেতা

পল্লীর প্রবেশমুখে ‘আয়েশা জামদানি হাউস’-এ রঙিন শাড়ি সাজানো, তবু দোকানে নিস্তব্ধতা। দোকান মালিক জাহিদ হাসান জুয়েল বলেন, “আগে এমন সময় হলে দোকানে ভিড় সামলাতে কষ্ট হতো। এখন সকাল থেকে বসে আছি, একজন কাস্টমারও আসে নাই।

জুয়েল তৃতীয় প্রজন্মের জামদানি ব্যবসায়ী। তাঁর দোকানে নিজস্ব তাঁতে বোনা জামদানির পাশাপাশি অন্য তাঁত থেকে আনা শাড়িও আছে। কিন্তু বিক্রি আশানুরূপ নয়। তিনি বলেন, “একসময় ৩০ লাখ টাকার বিক্রি হতো মাসে। এখন ৩ লাখও হচ্ছে না।

প্রতিবেদকের আধা ঘণ্টা অবস্থানেও দোকানে কোনো ক্রেতা ঢোকেননি। একই চিত্র প্রায় সব দোকানেই— বিক্রেতাদের মুখে হতাশা, গায়ে ঘাম নেই ক্রেতার ভিড়ে নয়, বরং চিন্তায়।

বিক্রি নাই, কিন্তু তাঁত বন্ধ হয় না

জামদানি পল্লির অন্য প্রান্তে কারিগরদের তাঁতঘরে কাজের তীব্র ব্যস্ততা। শীতলঘরে বসে লাল রঙের সুতোয় সোনালী নকশা তুলছেন ২৫ বছর বয়সী হাসান। চাঁদপুরের এই তরুণ ১২ বছর বয়স থেকে জামদানি বুনছেন। এখন তাঁর হাতে ৮০ কাউন্টের এক জামদানি, যেটি শেষ করতে লাগবে আরও চার দিন।

হাসান বলেন, “আমাদের ঈদ বা ছুটি বলে কিছু নাই। মহাজনের অর্ডার সারাবছরই থাকে। একটা শাড়ি তুলতে অনেক সময় লাগে, তাই তাঁত বন্ধ রাখা চলে না।”

একই কথা বললেন ৫০ বছর বয়সী তাঁতী মোবারক হোসেন। দুই দশকের অভিজ্ঞতা তাঁর কণ্ঠে। বলেন, “কাজের চাপ অনেক। আমরা তাঁত চালাই, বিক্রির হিসাব তো মহাজনের।”

দাম ও মানের সমন্বয়

জামদানির মান নির্ধারিত হয় সুতার কাউন্ট দিয়ে। ৩০ থেকে ১০০ কাউন্ট পর্যন্ত জামদানি বোনা হয়। কাউন্ট যত বেশি, সুতা তত চিকন— আর দামও তত বেশি। পল্লির তাঁতীরা জানালেন, একটি ১০০ কাউন্টের শাড়ি তৈরি করতে সময় লাগে এক মাসেরও বেশি। দাম পড়ে ৫০ হাজার টাকা থেকে কয়েক লাখ পর্যন্ত।

নকশী জামদানি উইভিং ফ্যাক্টরির মালিক সহিম হাসান বলেন, “আমাদের ক্রেতারা মূলত উচ্চবিত্ত শ্রেণির। তারা উৎসব নয়, বিশেষ অনুষ্ঠান বা বিয়েতে জামদানি কেনেন। তাই মৌসুমি উৎসবে বিক্রি বাড়ে না।”

সহিমের কারখানায় ৩০টি তাঁতে ৬০ জন কারিগর কাজ করেন। তিনি জানান, “২৫ লাখ টাকার বিজনেস করার কথা ছিল, কিন্তু তার চার ভাগের এক ভাগও হয়নি।”

অনলাইন বিক্রিও কম

পল্লির অনেক ব্যবসায়ী এখন অনলাইনেও জামদানি বিক্রি করেন। ‘অফলাইন ও অনলাইন— দুই দিকেই বিক্রি কম’, বললেন ব্যবসায়ী আনোয়ার হোসেন। তাঁর মতে, দেশের বর্তমান পরিস্থিতি, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা— সব মিলিয়ে বাজারে মন্দাভাব।

সুতার ব্যবসায়ীরাও ক্ষতিগ্রস্ত। রাজু শেখ নামের এক সরবরাহকারী জানান, শাড়ি বিক্রি না হলে সুতা বিক্রিও কমে যায়। আগের তুলনায় অর্ডার প্রায় অর্ধেক।

জামদানি শৌখিন পোশাক, তাই ক্রেতা সীমিত

রাজধানীর গুলশান থেকে জামদানি কিনতে এসেছিলেন ব্যবসায়ী মো. সাকিব। তাঁর মতে, “জামদানি শাড়ি দামি। মূলত শৌখিন পোশাক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সাধারণ ক্রেতার নাগালের বাইরে। ফলে অন্যান্য পোশাকের মতো এর চাহিদা বাড়ে না।

তাঁতীদের পরিশ্রমের ফল যে এত সীমিত ক্রেতার কাছে পৌঁছায়, সেটিই তাদের আক্ষেপ। এক নারী ক্রেতা রেহানা পারভীন বললেন, “আমার ননদের বিয়েতে জামদানি দিতে এসেছি। সুন্দর তো বটেই, কিন্তু দাম অনেক।

আশার আলো এখনো আছে

সব হতাশার মাঝেও তাঁতীরা থেমে নেই। তাঁদের বিশ্বাস, জামদানির ঐতিহ্য একদিন আবার নতুনভাবে জেগে উঠবে। ৬০ বছরের প্রবীণ তাঁতী সিরাজ উদ্দিন বলেন, এই কাজ আমাদের রক্তে। জামদানি কষ্টের, কিন্তু গরিমার। বাজার খারাপ থাকলেও তাঁত বন্ধ হইবে না।

বাংলার ঐতিহ্যের প্রতীক জামদানি আজও টিকে আছে এই কারিগরদের হাতের জোরে। বিক্রি কমে গেলেও তাঁতের শব্দ থেমে নেই। তাদের চোখে এখনো একটাই আশা— একদিন আবার ভিড় জমবে জামদানি পল্লিতে, যেমন ছিল সেই সোনালি দিনে।





স্বত্ব © ২০২৫ নিউজ ৩৬ এইসডি ।
Design & Developed BY POPCORN IT