বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬, ১০:২৪ পূর্বাহ্ন

সংবাদ শিরোনাম :
হুইলচেয়ার পেয়ে নতুন জীবন বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুর শৈত্যপ্রবাহে কাঁপছে রূপগঞ্জ: খড়কুটো জ্বালিয়ে উষ্ণতা খুঁজছেন সংবাদকর্মী ও সাধারণ মানুষ ২০২৫-এর শেষে দাঁড়িয়ে ২০২৬: আমরা কেমন বাংলাদেশ চাই নারায়ণগঞ্জে মনোনয়ন জমা শেষ: পাঁচ আসনে ৫৭ প্রার্থী রাষ্ট্রীয় শোকের কারণে ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার উদ্বোধন পেছাল, নতুন তারিখ ৩ জানুয়ারি বেগম খালেদা জিয়ার দাফন উপলক্ষে রাজধানীতে কঠোর ট্রাফিক ব্যবস্থা, বন্ধ থাকবে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সড়ক খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শেখ হাসিনার শোক খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও নেতাদের শোক জামালপুরে ১১০ বোতল ভারতীয় মদ জব্দ, আটক ১ রূপগঞ্জে বিএনপি প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমান ভূইয়ার মনোনয়নপত্র জমা
বিলুপ্তপ্রায় গরুর গাড়ি: আধুনিকতার চাপে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামীণ ঐতিহ্য

বিলুপ্তপ্রায় গরুর গাড়ি: আধুনিকতার চাপে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামীণ ঐতিহ্য

নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলার গ্রামীণ জনজীবনের এক সময়ের অপরিহার্য বাহন ছিল গরুর গাড়ি। দুই চাকায় ভর করে গরু বা বলদের টানে চলা এই পরিবহন মাধ্যম শুধু কৃষকের ফসল বহনের বাহনই নয়, ছিল গ্রামীণ জীবনের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির প্রতীক। একসময় হাটে যাওয়া, বিয়েবাড়ি, ফসল তোলা কিংবা মালপত্র পরিবহন—সবক্ষেত্রেই গরুর গাড়ির ভূমিকা ছিল অপরিসীম। কিন্তু আধুনিক যান্ত্রিক সভ্যতার অগ্রযাত্রায় আজ সেই ঐতিহ্য ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি জেলাতেই একসময় গরুর গাড়ির গরগর শব্দ আর গাড়িয়ালের গান ছিল গ্রামীণ জীবনের দৈনন্দিন সঙ্গী। নড়াইল, কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, রাজবাড়ী, নাটোর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, দিনাজপুর থেকে শুরু করে বরিশাল, খুলনা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রংপুর—সব অঞ্চলের মেঠোপথেই দেখা যেত সারিবদ্ধ গরুর গাড়ির চলাচল। এখন সেই দৃশ্য কেবল স্মৃতির পাতায়।

গরুর গাড়ির গঠন ও ব্যবহার

গরুর গাড়ি মূলত দুই চাকাবিশিষ্ট এক প্রকার কাঠের যান, যা গরু বা বলদে টানা হয়। চাকার অক্ষ কাঠের, এর ওপর কাঠের পাটাতন, আর সামনের অংশে জোয়ালে গরু জোড়া বাঁধা থাকে। একসঙ্গে দুই গরু মিলে গাড়ি টানে। এতে কোনো জ্বালানি লাগে না, কোনো শব্দ নেই, ধোঁয়া নেই, এমনকি দুর্ঘটনার আশঙ্কাও খুবই কম। এক অর্থে এটি ছিল সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব যানবাহন।

বছরের পর বছর ধরে কৃষকরা এই বাহন ব্যবহার করে আসছেন ফসল তোলা, ধান-কাটা মৌসুমে ধান বা পাট হাটে নেওয়া, খড়, গোবর, সার বা লাঙ্গল পরিবহনের কাজে। কোনো বিয়ে বা সামাজিক অনুষ্ঠানে ১০–১২টি গরুর গাড়ি সারিবদ্ধভাবে বরযাত্রার সাজে যেত। গরুর গাড়ি ছাড়াই কোনো উৎসব বা শোভাযাত্রা পূর্ণতা পেত না।

গাড়িয়াল পেশা: এক হারানো জীবিকা

গরুর গাড়ির সঙ্গে জড়িয়ে ছিল গাড়িয়াল নামের এক বিশেষ পেশা। এই গাড়িয়ালরা ছিলেন গ্রামীণ অর্থনীতির চালিকাশক্তি। ভোরবেলা আজানের সঙ্গে সঙ্গেই তারা গরুগুলো জোয়ালে জুড়ে পণ্য নিয়ে বের হতেন হাটের পথে। গাড়ির পেছনে বসে থাকতেন চালক, হাতে থাকত একখণ্ড লাঠি আর মুখে থাকত গরু তাড়ানোর সুরেলা ডাক।

ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গার বৃদ্ধ গাড়িয়াল নূরুল হক বলেন, “আমার বাপ-দাদার সময় গরুর গাড়ি ছাড়া জীবন কল্পনাই করা যেত না। হাটে যাওয়া, ফসল তোলা, বিয়ে বাড়ি—সব জায়গায় গরুর গাড়ি ছিল গর্বের বাহন। এখন আর কেউ চড়ে না, কেউ চালায়ও না।”

নড়াইলের বেতবাড়িয়া গ্রামের গাড়িয়াল জাহাঙ্গীর আলমের কথায়, “আগে গরুর গাড়ি চালিয়ে সংসার চলত। এখন ট্রলি, পাওয়ার টিলার, অটো এসে আমাদের পেশা কেড়ে নিয়েছে। কেউ আর গরুর গাড়িতে পণ্য নিতে চায় না।”

আধুনিকতার জাতাকলে ঐতিহ্যের বিলুপ্তি

বাংলাদেশে গত দুই দশকে কৃষিক্ষেত্রে যান্ত্রিকীকরণের ফলে গরুর গাড়ির প্রয়োজনীয়তা দ্রুত কমে গেছে। পাওয়ার টিলার, ট্রাক, লরি, ভ্যান ও নসিমন-করিমন এখন গ্রামীণ পরিবহনের প্রধান বাহন। ফসল পরিবহন থেকে মানুষের যাতায়াত—সব জায়গায় মেশিনের দাপট।

অর্থনীতিবিদদের মতে, দ্রুত পণ্য পরিবহনের চাহিদা ও সময়ের মূল্যবোধই গরুর গাড়ির বিলুপ্তির প্রধান কারণ। যান্ত্রিক বাহনে যেখানে কয়েক ঘণ্টায় কাজ শেষ হয়, সেখানে গরুর গাড়িতে সময় লাগে পুরো দিন। ফলে কৃষক বা ব্যবসায়ীরা আর আগের মতো এ বাহন ব্যবহার করতে চান না।

তবে পরিবেশবিদরা বলছেন, গরুর গাড়ির বিলুপ্তি শুধু ঐতিহ্য নয়, পরিবেশবান্ধব একটি ব্যবস্থারও মৃত্যু। এ বাহনে কোনো জ্বালানি খরচ হয় না, ফলে কার্বন নিঃসরণ নেই। কোনো শব্দ দূষণ হয় না। আবার ধীর গতিতে চলার কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও নেই।

সংস্কৃতিতে গরুর গাড়ির উপস্থিতি

গরুর গাড়ি শুধু পরিবহনের অংশ ছিল না, এটি ছিল বাঙালি সংস্কৃতির এক নান্দনিক প্রতীক। কবি-সাহিত্যিকরা লিখেছেন গরুর গাড়িকে নিয়ে অসংখ্য কবিতা ও গল্প। ভাওয়াইয়া গানে এসেছে এর রূপ, সবচেয়ে জনপ্রিয় গান—‘ওকি গাড়িয়াল ভাই, কত রব আমি পন্থের দিকে চাইয়া রে.

একসময় নাটক, সিনেমা, লোকসংগীত, এমনকি শিশুসাহিত্যেও গরুর গাড়ির প্রতীকী উপস্থিতি দেখা যেত। কিন্তু আজকের প্রজন্মের অনেক শিশু গরুর গাড়ির নামই জানে না। শহরের শিশুরা তো দূরের কথা, গ্রামাঞ্চলের বাচ্চারাও গরুর গাড়ির শব্দ বা গতি কখনো প্রত্যক্ষ করেনি।

বিলুপ্তির পথে ঐতিহ্য, জেগে উঠছে নস্টালজিয়া

চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির শিক্ষক আবদুল খালেক জানান, “শৈশবে গরুর গাড়িতে চড়ে হাটে যেতাম, এখন সন্তানদের সেই অভিজ্ঞতা দিতে পারি না। তারা গরুর গাড়ি দেখে টিভি বিজ্ঞাপনে।”

রাজশাহীর কৃষক অনিল লস্কর বলেন, “গরুর গাড়ি ছিল পরিবেশবান্ধব বাহন। ট্রাক বা লরির মতো জ্বালানি খরচ নেই, দূষণও নেই। এখন এই গাড়িগুলো ইতিহাস হয়ে যাচ্ছে। সরকার যদি ঐতিহ্য হিসেবে সংরক্ষণ করত, তাহলে অন্তত ভবিষ্যৎ প্রজন্ম জানত আমাদের অতীত।”

সংরক্ষণের প্রয়োজন

ঐতিহ্যবাহী এই বাহনটিকে সংরক্ষণের দাবি উঠেছে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের পক্ষ থেকেও। ইতিহাসবিদদের মতে, যেভাবে পালকি, ঢেঁকি, চাতাল বা হস্তচালিত কল ইতিহাসের পাতায় স্থান পেয়েছে, গরুর গাড়িকেও সেইভাবে ঐতিহ্য হিসেবে সংরক্ষণ করা জরুরি।

বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন ইতিমধ্যে সোনারগাঁ জাদুঘরে একটি ঐতিহ্যবাহী গরুর গাড়ি সংরক্ষণ করেছে। একইভাবে দেশের প্রতিটি বিভাগের জাদুঘরে যদি একটি করে বাস্তব গরুর গাড়ি প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা হয়, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম জানবে তাদের ঐতিহ্য কী ছিল।

পরিবেশবিদ  বলেন, “গরুর গাড়ি আমাদের ইতিহাসের এক জীবন্ত অধ্যায়। এটা শুধু বাহন নয়, ছিল এক সময়ের জীবনের অংশ। আমরা যদি ঐতিহ্য ধরে রাখতে চাই, তবে এই বাহনটিকে গবেষণা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে সংরক্ষণ করতে হবে।”

শেষ কথা

যুগের পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী। নতুন প্রযুক্তি জীবনের গতি বাড়িয়েছে, কিন্তু এর বিনিময়ে হারিয়ে যাচ্ছে অতীতের নান্দনিকতা। গরুর গাড়ি সেই হারানো ঐতিহ্যের প্রতীক, যা একসময় বাঙালির গ্রামীণ জীবনের হৃদয়স্থলে ছিল।

যান্ত্রিক সভ্যতার দৌড়ে গরুর গাড়ি হয়তো আর ফিরবে না আগের রূপে। কিন্তু সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে এটি সংরক্ষিত থাকুক—এটাই এখন সময়ের দাবি। কারণ যে জাতি নিজের ঐতিহ্য ভুলে যায়, তার ভবিষ্যৎও একদিন হারিয়ে যায় ইতিহাসের অন্ধকারে।





স্বত্ব © ২০২৫ নিউজ ৩৬ এইসডি ।
Design & Developed BY POPCORN IT