বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬, ১২:০৬ অপরাহ্ন

সংবাদ শিরোনাম :
হুইলচেয়ার পেয়ে নতুন জীবন বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুর শৈত্যপ্রবাহে কাঁপছে রূপগঞ্জ: খড়কুটো জ্বালিয়ে উষ্ণতা খুঁজছেন সংবাদকর্মী ও সাধারণ মানুষ ২০২৫-এর শেষে দাঁড়িয়ে ২০২৬: আমরা কেমন বাংলাদেশ চাই নারায়ণগঞ্জে মনোনয়ন জমা শেষ: পাঁচ আসনে ৫৭ প্রার্থী রাষ্ট্রীয় শোকের কারণে ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার উদ্বোধন পেছাল, নতুন তারিখ ৩ জানুয়ারি বেগম খালেদা জিয়ার দাফন উপলক্ষে রাজধানীতে কঠোর ট্রাফিক ব্যবস্থা, বন্ধ থাকবে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সড়ক খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শেখ হাসিনার শোক খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও নেতাদের শোক জামালপুরে ১১০ বোতল ভারতীয় মদ জব্দ, আটক ১ রূপগঞ্জে বিএনপি প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমান ভূইয়ার মনোনয়নপত্র জমা
৭ নভেম্বর: সিপাহী-জনতার বিপ্লবের দিন

৭ নভেম্বর: সিপাহী-জনতার বিপ্লবের দিন

বিশেষ প্রতিবেদকঃ

১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর—বাংলাদেশের ইতিহাসে এক মোড় ঘোরানো দিন। কাকডাকা ভোর থেকেই সেদিন শহর-বন্দর, গ্রাম-গঞ্জের পথে নেমে এসেছিল হাজারো মানুষ। রেডিওতে উচ্চারিত হয় এক কণ্ঠ—আমি জিয়া বলছি। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি যেন ফিরে আসে নতুন করে। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে জনতা। বুকের ওপর থেকে সরে যায় এক দুঃসহ ভার। পথে পথে শুরু হয় বিপ্লব আর বিজয় উল্লাসের মিছিল।

জনতার করতালিতে মুখরিত চারপাশ। সিপাহী-জনতার কাঁধে কাঁধ, হাতে হাত—এক কণ্ঠে ধ্বনি ওঠে, সিপাহী-জনতা ভাই ভাই, বাংলাদেশ জিন্দাবাদ, মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান জিন্দাবাদ।
এ দিনটি শুধু একটি অভ্যুত্থান নয়—এ ছিল এক নতুন সূচনার প্রতীক।

এই বিপ্লবের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ চরম বিশৃঙ্খলা ও অনিশ্চয়তার অন্ধকার থেকে নতুন পথে যাত্রা শুরু করে। সেনাপ্রধান জেনারেল জিয়াউর রহমান হয়ে ওঠেন সেই সময়ের জাতির নেতৃত্বের প্রতীক। ৭ নভেম্বরের পর শুরু হয় আত্মমর্যাদাশীল, স্বকীয় ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’-এর বিকাশ। আর এই সূর্যোদয়ের নায়ক হয়ে ওঠেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান।

১৯৭৫ সালের ঘটনাপ্রবাহের প্রত্যক্ষদর্শী এলডিপি চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ, বীর বিক্রম, বাসসকে বলেন—১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ রাতে তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে আর্মি প্রথম বিদ্রোহ করে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে। ওই রাতে তিনি সবাইকে আহ্বান জানান মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে। অন্যদিকে শেখ মুজিব পাকিস্তানিদের হাতে বন্দি ছিলেন। স্বাধীনতার পর দেশে ফিরে তিনি রক্ষীবাহিনী ও মুজিব বাহিনী গঠন করে সেনাবাহিনীর বাইরে আলাদা শক্তি তৈরি করেন, যা সশস্ত্র বাহিনীতে ক্ষোভ সৃষ্টি করে।

তিনি বলেন, এই ক্ষোভেরই ফল ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড। পরে খন্দকার মোশতাক রাষ্ট্রপতি হন, আর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ ৩ নভেম্বর সেনা অভ্যুত্থান ঘটিয়ে জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দি করেন। কিন্তু সৈনিকরা এই অবস্থা মেনে নেয়নি। ৭ নভেম্বর তারা বিদ্রোহ করে জিয়াকে মুক্ত করে সেনাপ্রধানের দায়িত্ব ফিরিয়ে দেয়।

অলি আহমেদ বলেন, “৭ নভেম্বরের অভ্যুত্থানটি হয়েছিল আওয়ামী লীগের হাত থেকে দেশকে মুক্ত করার জন্য। খালেদ মোশাররফের ক্যু বিদেশি শক্তির সহায়তায় হয়েছিল। তিন দিনের মধ্যে সেনাবাহিনীতে চরম বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়, এবং শেষ পর্যন্ত ৭ নভেম্বর সৈনিক-জনতা একত্রিত হয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন,৭ নভেম্বরের ঘটনার সঙ্গে ১৫ আগস্ট ও ৩ নভেম্বরের হত্যাকাণ্ডের যোগসূত্র আছে। খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থানে সেনাবাহিনীর চেইন অব কমান্ড ভেঙে যায়। এতে বাহিনীর ভেতরে বিভাজন সৃষ্টি হয়—একপক্ষ মোশাররফের সঙ্গে, অপর পক্ষ জিয়াউর রহমানের প্রতি অনুগত।”

তিনি বলেন, এই অবস্থায় অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল আবু তাহের ও জাসদের বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা সক্রিয় হয়। তারা সৈনিকদের মধ্যে প্রচার চালায় যে খালেদের অভ্যুত্থান ভারতের পক্ষে। ফলে সৈনিকদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।

মেজর হাফিজ বলেন, ৭ নভেম্বর রাতে বিদ্রোহ হয়, এবং সৈনিকরা বন্দিদশা থেকে জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করে সেনা সদর দপ্তরে নিয়ে আসে। তিনি সেখান থেকে সেনাবাহিনীর দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। জিয়া তখনই বলেন, ‘আমি রাজনীতি করবো না, আমি সেনাবাহিনীকে শৃঙ্খলায় ফিরিয়ে আনবো।’ পরে কর্নেল তাহেরের নেতৃত্বাধীন বিশৃঙ্খলা দমন করে তিনি চেইন অব কমান্ড পুনঃস্থাপন করেন।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন,যখন শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হয় না, তখনই আরেকটা পথ খুলে যায়। ৩ নভেম্বর জিয়াকে বন্দি করার পর ৭ নভেম্বর দেশপ্রেমিক সেনারা তাকে মুক্ত করে। এর মাধ্যমে দেশে বহুদলীয় রাজনীতির পথ উন্মুক্ত হয়। এ দিনটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠার মোড় ঘোরানো মুহূর্ত।

তিনি বলেন, “৭ নভেম্বর শুধু সামরিক বিদ্রোহ নয়, এটি ছিল জনগণ ও সেনাবাহিনীর ঐক্যের প্রতীক। জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে দেশ গণতন্ত্র ও উন্নয়নের পথে অগ্রসর হয়।

বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন,৭ নভেম্বর ছিল গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের দিন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছিল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, যা একদলীয় শাসনে দমিয়ে রাখা হয়েছিল। ৭ নভেম্বরের মাধ্যমে বাংলাদেশ আবার বহুদলীয় রাজনীতিতে ফিরে আসে।

তিনি স্মৃতিচারণ করে বলেন, ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ অভ্যুত্থান ঘটিয়ে জিয়াকে বন্দি করেন। কিন্তু পাঁচ দিন পরই সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থানে জিয়া মুক্ত হন। জাতির উদ্দেশ্যে তিনি ভাষণ দেন—শান্ত থাকার আহ্বান জানান এবং দেশ রক্ষার অঙ্গীকার করেন। পরে সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে রাষ্ট্রপতি পদে নিয়োগ পান।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ৭ নভেম্বরের পর প্রেসিডেন্ট জিয়ার নেতৃত্বে বাংলাদেশ নতুন গতিপথে পা রাখে। স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব দৃঢ় হয়, গণতন্ত্র অর্গলমুক্ত হয়। মানুষ পায় আশার আলো, ফিরে আসে স্থিতি ও শৃঙ্খলা।

বিশ্লেষকরা বলেন, জিয়া ছিলেন সাহসী সেনানায়ক, যিনি ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন এবং মুক্তিযুদ্ধে সম্মুখসারিতে নেতৃত্ব দেন। ৭ নভেম্বরের বিপ্লব তার জনপ্রিয়তাকে আরও সুদৃঢ় করে। তিনি সেনাবাহিনীকে পাঁচ ব্রিগেড থেকে পাঁচ ডিভিশনে উন্নীত করেন, কৃষি ও শিল্পে বিপ্লব ঘটান, এবং দেশকে আত্মনির্ভরতার পথে নিয়ে যান।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ বলেন,
৩ নভেম্বর খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থানের সময় জিয়াকে বন্দি করা হলে সারাদেশে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। মানুষ ভাবছিল—জাতির এই মহান সন্তানকে হারালে দেশ দিশেহারা হয়ে পড়বে। ৭ নভেম্বর সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থানে জিয়া মুক্ত হন—জাতি যেন নতুন করে আশার আলো খুঁজে পায়।

তিনি আরও বলেন, ৭ নভেম্বরের পর থেকেই এই দিনটি পালন করা হচ্ছে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার শপথ হিসেবে। এটি কেবল একটি দলের নয়—জাতীয় ঐক্য, সৈনিক-জনতার সংহতির প্রতীক। ৭ নভেম্বরের শিক্ষা হলো, যখন জাতি সংকটে পড়ে, তখন জনগণ ও সেনাবাহিনী এক হয়ে দাঁড়ায় দেশের পক্ষে।

বাংলাদেশের ইতিহাসে ৭ নভেম্বর কেবল একটি তারিখ নয়; এটি এক সময়ের প্রতীক, যখন জনতার শক্তি ও সেনাবাহিনীর ঐক্যে রাষ্ট্রের নতুন সূচনা হয়েছিল।
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে দেশ এগিয়ে গিয়েছিল আত্মনির্ভরতার পথে।
জাতির ইতিহাসে এই দিনটি তাই আজও উচ্চারিত হয় -সিপাহী-জনতা ভাই ভাই, বাংলাদেশ জিন্দাবাদ।





স্বত্ব © ২০২৫ নিউজ ৩৬ এইসডি ।
Design & Developed BY POPCORN IT