নিজস্ব প্রতিবেদক : ঢাকা, ১১ ডিসেম্বর ২০২৫
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে প্রথমবারের মতো প্রবাসীদের জন্য চালু হওয়া ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপ বৈশ্বিক বাংলাদেশিদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। ইতোমধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত ৩ লাখ ৭ হাজার ৫৭৭ জন প্রবাসী বাংলাদেশি ভোটার এই অ্যাপের মাধ্যমে নিবন্ধন করেছেন। নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ওয়েবসাইটে বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা পর্যন্ত প্রকাশিত পোস্টাল ভোটিং আপডেটে এ তথ্য উঠে আসে।
প্রবাসীদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল— দূর থেকে ভোট দেওয়ার সুযোগ। এবার সেই সুযোগ হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে প্রযুক্তিনির্ভর এই উদ্যোগ। ইসি বলছে, বিদেশে কর্মরত বা অবস্থানরত বাংলাদেশিদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে এবারই প্রথম এত বিস্তৃত পরিসরে পোস্টাল ব্যালট সুবিধা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, নিবন্ধিত ভোটারদের মধ্যে ২ লাখ ৮৪ হাজার ৩৪৯ জন পুরুষ এবং ২৩ হাজার ২২৮ জন নারী। নারীদের অংশগ্রহণ এবারও সন্তোষজনক হলেও আরও বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে বলে বিশ্লেষকদের মত।
সৌদি আরবে অবস্থানরত বাংলাদেশিরাই সবচেয়ে বেশি সাড়া দিয়েছেন। দেশটিতে নিবন্ধন করেছেন ৮৪ হাজার ৬০০ জন ভোটার। এর পরেই রয়েছে কাতার (২৫,২৫৭), যুক্তরাষ্ট্র (২০,৭৫৫), সংযুক্ত আরব আমিরাত (১৯,৮৫২), মালয়েশিয়া (১৮,১৫৬), সিঙ্গাপুর (১৫,২৯৪) এবং যুক্তরাজ্য (১৩,৬৬৩)।
ওমান, ইতালি, কানাডা, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া, কুয়েত ও জাপানেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রবাসী আবেদন করেছেন। এসব দেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের বড় অংশই বহু বছর ধরে ভোট দিতে পারেননি; এবার তাদের ভোটাধিকার নিশ্চিত হওয়ায় আনন্দের পাশাপাশি আশাবাদও দেখা যাচ্ছে।
নির্বাচনী দায়িত্বে নিয়োজিত সরকারি চাকরিজীবীরা নিজেদের ভোটার এলাকায় অবস্থান না করলে তারা পোস্টাল ভোটের জন্য আবেদন করতে পারবেন ২৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত। তফসিল ঘোষণার দিন থেকে শুরু হওয়া এই সুযোগটি মূলত নির্বাচনকালীন কর্মব্যস্ত সরকারি কর্মকর্তাদের ভোটাধিকার অক্ষুণ্ণ রাখতেই দেওয়া হয়েছে।
ইসি সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ বলেন, “পুলিশ, সেনাবাহিনী, আনসারসহ নির্বাচনের সরাসরি মাঠপর্যায়ের কাজে নিয়োজিতদের নিবন্ধন সময় কিছুটা পরেও নেওয়া হবে। তবে সাধারণ সরকারি কর্মচারী এবং আইনি হেফাজতে থাকা ভোটারদের নিবন্ধন অবশ্যই ১৫ দিনের মধ্যে সম্পন্ন করতে হবে।”
তিনি আরও জানান, প্রবাসী ভোটারদের আগ্রহ বিবেচনায় ‘আউট অব কান্ট্রি ভোটিং’ নিবন্ধনের সময়সীমা বাড়িয়ে ২৫ ডিসেম্বর মধ্যরাত পর্যন্ত করা হয়েছে।
প্রবাসীদের অনুরোধে সৌদি আরবসহ সাতটি দেশে বৈদেশিক ঠিকানা সংশোধনের সময় বৃদ্ধি করেছে ইসি। নতুন সময়সীমা ১৪ ডিসেম্বর সকাল ৯টা পর্যন্ত। সংশোধন সুযোগপ্রাপ্ত দেশগুলো হলো— সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, ওমান, কুয়েত ও বাহরাইন।
ইসি জানায়, সংশোধিত ঠিকানাই পোস্টাল ব্যালট পাঠানোর ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হবে, তাই সঠিক তথ্য দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। অনেক প্রবাসী পূর্ববর্তী বাসস্থানের ঠিকানা দিয়ে রেখেছিলেন, যার ফলে ডেলিভারিতে সমস্যা হতে পারে— এমন আশঙ্কা থেকেই সময় বাড়ানো হয়।
ইসির বার্তায় বলা হয়েছে, পোস্টাল ব্যালট পেতে হলে অবস্থানরত দেশের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ ঠিকানা দিতে হবে। প্রয়োজনে কর্মস্থলের ঠিকানা বা পরিচিত কারও ঠিকানাও ব্যবহার করা যেতে পারে। ভুল বা অসম্পূর্ণ ঠিকানা দিলে ব্যালট পেপার পাওয়া নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না।
ইসি কর্মকর্তারা মনে করেন, ঠিকানা যাচাই— পোস্টাল ভোটিংয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। কারণ ভোটপত্র যাচ্ছে আন্তর্জাতিক ডাকযোগে, ফলে ছোট একটি ভুলও ব্যালট পেতে বড় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে।
গত ১৮ নভেম্বর প্রধান নির্বাচন কমিশনার ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপ উদ্বোধন করেন এবং ঘোষণা দেন ১৪৮টি দেশে ভোটার নিবন্ধন নেওয়া হবে। এতো বিস্তৃত আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো এই সেবা চালু করেছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
পোস্টাল ব্যালট পেতে হলে প্রবাসী ভোটারদের অবশ্যই ওই দেশের মোবাইল নম্বর ব্যবহার করতে হবে। অ্যাপ ডাউনলোড থেকে শুরু করে নিবন্ধন পর্যন্ত পুরো কার্যক্রমই ডিজিটাল, যা পুরো প্রক্রিয়াকে সহজ ও দ্রুত করেছে।
প্রবাসী বাংলাদেশিদের প্রথমেই গুগল প্লে স্টোর বা অ্যাপ স্টোর থেকে ‘Postal Vote BD’ অ্যাপ ডাউনলোড করতে হবে। এরপর জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট তথ্য, বর্তমান ঠিকানা এবং ওই দেশের মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে আবেদন সম্পন্ন করা যাবে।
নিবন্ধনের পর ভোটার যাচাই-বাছাই শেষে সংশ্লিষ্ট ঠিকানায় পাঠানো হবে পোস্টাল ব্যালট। ভোটারকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তা পূরণ করে ডাকযোগে ফেরত পাঠাতে হবে।
বিভিন্ন দেশে থাকা অনেক বাংলাদেশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও প্রবাসী সংগঠনের মাধ্যমে জানাচ্ছেন— বিশেষত মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত শ্রমিকেরা এবার ভোট দিতে পারছেন বলে উচ্ছ্বসিত।
সৌদি আরবের দম্মাম থেকে মোহাম্মদ সাঈদ নামে এক প্রবাসী বলেন, “বাংলাদেশ থেকে দূরে থাকায় এত দিন ভোট দিতে পারতাম না। এবার ভোট দিতে পারব— এটাই সবচেয়ে আনন্দের খবর।”
কাতার, মালয়েশিয়া ও দুবাইয়ের বাংলাদেশি কমিউনিটিতেও ব্যাপক প্রচারণা চলছে— সবাইকে অ্যাপ ডাউনলোড করে নিবন্ধনের আহ্বান জানানো হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রবাসীরা দেশের অর্থনীতির বড় চালিকাশক্তি। তাদের পাঠানো রেমিট্যান্সে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী থাকে। তাই এই জনগোষ্ঠীর ভোটাধিকার নিশ্চিত করা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার শক্তি বাড়াবে।
ইসি কর্মকর্তারা বলছেন, বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশও ডিজিটাল ভোটিং বা দূরবর্তী ভোট প্রয়োগে প্রযুক্তি ব্যবহার করে আরও এগিয়ে যাবে।
#NEWS36hD*