সোমবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৪:৪৫ পূর্বাহ্ন

সংবাদ শিরোনাম :
গাজীপুরে পাঁচ দিনের জোড় ইজতেমায় মুসল্লিদের উপচে পড়া ভিড় জামালপুরে জামায়াতের অর্ধশতাধিক নেতাকর্মীর বিএনপিতে যোগদান শিশিরভেজা ঘাসে খালি পায়ে হাঁটা: স্বাস্থ্য–মনের জন্য অনন্য উপকার একের পর এক ভূমিকম্প: রহস্য ভাঙল বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণে রাজশাহীতে আটা, চিনি, কাপড়ের রং দিয়ে তৈরি হচ্ছে খেজুরের গুড় শীতলক্ষ্যা বাঁচাতে রূপগঞ্জে জামায়াত প্রার্থীর শোভাযাত্রা ঢাকার ভূমিকম্প ঝুঁকি বিশ্লেষণ: কোন এলাকায় কতটা বিপদ, বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন নারী উদ্যোক্তা তনিকে নিয়ে মানহানির অভিযোগে গ্রেপ্তার আকাশ নিবিড় কারাগারে ঢাকা  শহরে এলাকাভিত্তিক বাড়িভাড়া নির্ধারণে উদ্যোগ: ডিএনসিসি নারায়ণগঞ্জে ত্বকী হত্যা মামলা: ৯৯তম তারিখেও চার্জশিট নেই, ক্ষোভ বাদীপক্ষে
ঢাকার ভূমিকম্প ঝুঁকি বিশ্লেষণ: কোন এলাকায় কতটা বিপদ, বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন

ঢাকার ভূমিকম্প ঝুঁকি বিশ্লেষণ: কোন এলাকায় কতটা বিপদ, বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন

নিজস্ব প্রতিবেদক :

ঢাকা মহানগরী বিশ্বের অন্যতম ভূমিকম্পঝুঁকিপূর্ণ শহর হিসেবে পরিচিত। দ্রুত নগরায়ণ, অপরিকল্পিত ভবন নির্মাণ, নদী–খাল ভরাট করে নতুন এলাকা সৃষ্টি, আর প্রাচীন ভবনের অবকাঠামোগত দুর্বলতা সব মিলিয়ে রাজধানী যে কোনো বড় কম্পনে মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে। সম্প্রতি ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ ও সরকারি সংস্থাগুলোর গবেষণা রাজধানীর অস্তিত্বই চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে।

শত বছরের পুরনো মাটির অঞ্চল কিছুটা নিরাপদ

ঢাকার কয়েকটি অঞ্চল বহু শতাব্দী ধরে গঠিত প্রাচীন মাটি দিয়ে তৈরি। এসব এলাকায় মাটির ঘনত্ব ও শক্তি তুলনামূলক বেশি হওয়ায় বড় কম্পনের অভিঘাত কিছুটা কম অনুভূত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই এলাকাগুলো—
রমনা, পল্টন, মগবাজার, নিউমার্কেট, লালমাটিয়া, কোতয়ালি, সবুজবাগ, খিলগাঁও, মতিঝিল, ধানমন্ডি, শেরে বাংলা নগর, মিরপুর, ক্যান্টনমেন্ট, পল্লবী, শাহ–আলী, লালবাগ, গেন্ডারিয়া, গুলশান ও তেজগাঁও।

এই অঞ্চলের মাটি শক্ত হলেও ভবনের নির্মাণ মান, বয়স, কাঠামোগত স্থায়িত্ব এবং জনঘনত্ব—সব মিলিয়ে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা নির্ভর করবে বাস্তব পরিস্থিতির ওপর। তবুও, ভূপ্রকৃতি বিবেচনায় এগুলো ‘তুলনামূলক কম ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে ধরা হয়।

পুরান ঢাকার বিপদ ভিন্ন—মাটি নয়, ভরসা নেই ভবনে

পুরান ঢাকার মাটি যদিও শক্ত এবং ভূমিকম্প সহনক্ষম, তবু বৃহৎ বিপদের কেন্দ্রবিন্দু হলো পুরনো ভবনগুলো।
এখানে শত বছরের পুরোনো অসংখ্য ভবন রয়েছে, যেগুলোর বেশিরভাগই ভূমিকম্প প্রতিরোধী নয়।
পাশাপাশি সরু রাস্তা, অতিরিক্ত জনঘনত্ব এবং খুতখুতে অবকাঠামো একটি বড় কম্পনের পর উদ্ধারকাজকে নিদারুণ কঠিন করে তুলতে পারে।

অপরদিকে, অনেক ভবনই একাধিকবার পরিবর্তন বা সম্প্রসারণ করা হয়েছে, যার প্রকৌশলগত যথার্থতা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন আছে। ফলে শক্ত মাটির উপর দাঁড়ানো দুর্বল ভবনগুলো বড় ভূমিকম্পে ধসে পড়ার ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি।

ঢাকার সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ১৫টি এলাকা—প্রতিটি কারণেই ভয়াবহ

বিভিন্ন গবেষণা, বিশেষ করে ভূতাত্ত্বিক জরিপ ও নগর পরিকল্পনা বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণে দেখা যায়, ঢাকার সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলগুলো মূলত ভরাট জমি বা নরম মাটি দিয়ে গঠিত।
সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ১৫টি এলাকা হলো:
সবুজবাগ, কামরাঙ্গীরচর, হাজারীবাগ, কাফরুল, ইব্রাহিমপুর, কল্যাণপুর, গাবতলী, উত্তরা, সূত্রাপুর, শ্যামপুর, মানিকদী, মোহাম্মদপুর, পল্লবী, খিলগাঁও ও বাড্ডা।

কেন ঝুঁকি এত বেশি?

অনেক এলাকা নদী–খাল–জলাশয় ভরাট করে গড়ে তোলা

নরম মাটি বড় কম্পনে তরল হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি (Liquefaction)

অতিরিক্ত জনঘনত্ব

ভবনগুলোতে ভূমিকম্প প্রতিরোধী নকশার অভাব

দ্রুত নগরায়ণ এবং নির্মাণ তদারকির ঘাটতি

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বড় ভূমিকম্পের সময় এসব এলাকায় মাটির নড়াচড়ার মাত্রা এত বেশি হতে পারে যে, একই ওজনের ভবন তুলনামূলক শক্ত মাটির এলাকায় যেমন থাকে, এখানে তেমনটি দাঁড়িয়ে থাকার সম্ভাবনা কম।

মধুপুর ফল্টলাইন—ঢাকার দরজায় লুকিয়ে থাকা বিপর্যয়

আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রুবাইয়াত কবীর জানান,
ঢাকার ভেতরে ৮–৯ মাত্রার ভূমিকম্প সৃষ্টিকারী বড় কোনো ফল্টলাইন নেই।
তবে ঢাকার মাত্র ৬০ কিলোমিটার দূরে মধুপুর ফল্ট ৭ মাত্রার এক শক্তিশালী ভূমিকম্প ঘটানোর মতো সক্রিয় রয়েছে।

তার মতে,
“মধুপুর ফল্টে ৭ মাত্রার কম্পন হলে ঢাকার যে সব অঞ্চল নতুনভাবে ভরাট করে গড়ে তোলা হয়েছে, সেগুলোতে ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। হতাহতের সংখ্যা অতীতের রেকর্ড ছাড়িয়ে যেতে পারে। এমনকি শহরের ভূপ্রকৃতি বদলে যাওয়ার মতো পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে।”

এই মন্তব্য রাজধানীর ঝুঁকি কতটুকু ভয়াবহ হতে পারে তা স্পষ্ট করে।

আধুনিক ঢাকার দুর্বলতা—নগরায়ণ যত এগোচ্ছে, বিপদও তত বাড়ছে

বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ বলছে—

ঢাকার সম্প্রসারণ মূলত জলাশয়, নিম্নভূমি ও খাল ভরাট করে হয়েছে

এসব জায়গায় ১০–২০ তলা পর্যন্ত ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে

মাটির প্রকৃতি বিবেচনায় কোনো কোনো এলাকায় মাত্র ৫–৬ তলার বেশি নিরাপদ নয়

ভবন নির্মাণ কোড অনেক ক্ষেত্রেই মানা হয় না

নতুন বাণিজ্যিক এলাকা, আবাসিক ব্লক, সড়ক ও ড্রেনেজ—সবই তাড়াহুড়ায় নির্মিত

ফলে ভূমিকম্পের আঘাত হঠাৎ নামলে বিপর্যয়ের মাত্রা ভয়াবহ হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের জরুরি করণীয়

ভূমিকম্প মোকাবিলায় বিশেষজ্ঞরা যেসব পদক্ষেপ দ্রুত নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন:

ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা তৈরি ও পুনর্গঠন

নরম মাটির এলাকায় নতুন ভবন নির্মাণে কঠোর ভূ–প্রকৌশল পরীক্ষা

জরুরি সেবা ও উদ্ধার দলের সক্ষমতা বাড়ানো

বিল্ডিং কোড কঠোরভাবে বাস্তবায়ন

নাগরিকদের প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা বৃদ্ধি

তাদের মতে, ঢাকাকে টেকসই করতে হলে এখনই ব্যাপক সংস্কার ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।

ঢাকা এমন একটি শহর যেখানে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ নতুন করে বসতি গড়ছে, ব্যবসা করছে, ভবন উঠছে। কিন্তু ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের জন্য এই শহর প্রস্তুত নয়। নতুন ভরাট করা জমি, পুরনো দুর্বল ভবন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং উপেক্ষিত নির্মাণ মান—সব মিলিয়ে রাজধানী যে কোনো বড় কম্পনে বিপর্যস্ত হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের সতর্ক বার্তা অগ্রাহ্য না করে এখনই সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে না পারলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ভয়াবহতার মূল্য দিতে হতে পারে—এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।





স্বত্ব © ২০২৫ নিউজ ৩৬ এইসডি ।
Design & Developed BY POPCORN IT