সাপ্তাহিক ফিচার পাতা, নিউজ৩৬এইচডি
নিজস্ব প্রতিবেদকঃ
বাংলা ক্যালেন্ডারে কার্তিক পেরিয়ে অগ্রহায়ণ এলেই প্রকৃতি বদলে যায়। রাতের শেষে শিশির ঝরে, সকালের রোদে থাকে কোমল উষ্ণতা, বাতাসে মিশে থাকে এক অচেনা ঠান্ডা গন্ধ। শহর-গ্রাম, মফস্বল কিংবা নদীপাড়—সবখানেই এখন এক মৃদু নীরবতা, কুয়াশায় মোড়া সকাল যেন জানিয়ে দিচ্ছে, বাংলায় শীত এসে গেছে।
ভোরের আগে গ্রামের পথ ঘন কুয়াশায় ঢেকে যায়। দূরের বাঁশঝাড় আর গাছের রেখাগুলো যেন মিলিয়ে যায় সাদা ধোঁয়ার চাদরে। উঠোনে হাঁস-মুরগির ডাক, দূরে গরুর ঘণ্টার শব্দ—সব মিলিয়ে শীতের ভোরের সিম্ফনি।
মাঠে এখন ধান কাটা চলছে। কৃষকরা গায়ে মোটা গামছা জড়িয়ে ভোরেই বেরিয়ে পড়েন মাঠে। নতুন ধানের গন্ধে ভরে ওঠে গ্রাম, উঠোনে শুকাতে দেওয়া হয় ধান আর পাটের আঁশ। কেউ কেউ খড়ের গাদার পাশে আগুন জ্বেলে গা পোহায়, পাশে বসে ছোটরা পিঠার অপেক্ষায়।
শীতের গ্রামে এখন প্রতিদিনই উৎসবের আমেজ। কোথাও বিয়ের আয়োজন, কোথাও পিঠা উৎসব, আবার কোথাও নতুন ফসল ঘরে তোলার আনন্দ। বয়স্করা বলে—“এই সময়টাই বাঁচার সময়, কাজও আছে, খাওয়ারও সুখ আছে।”

শীত মানেই শহরের সকাল একটু অলস। সূর্য ওঠে দেরিতে, বাতাসে ঠান্ডার ছোঁয়া। রাস্তার ধারে দোকানদাররা গায়ে চাদর জড়িয়ে চা বানায়, ধোঁয়া ওঠা কাপে জমে সকালবেলার আড্ডা। অফিসপথের মানুষদের হাতে গ্লাভস, মুখে হালকা হাসি—শীত যেন শহরবাসীকে একটু ধীর করে দেয়।
ফুটপাতের পাশে এখন দেখা যায় বাদামভাজা, ভুট্টা, আর কফির স্টল। রিকশাওয়ালারা গায়ে সোয়েটার, চালকের আসনে ছোট একটি কম্বল। স্কুলগামী বাচ্চাদের টুপি আর উলের মোজা পরে থাকা মুখে থাকে শীতের নতুন অভিজ্ঞতার আনন্দ।
রাস্তায় শুকনো পাতা উড়ছে, আর সেই সঙ্গে শহরও সাজছে উৎসবের রঙে—বিক্রির চাপে ব্যস্ত গরম পোশাকের দোকান, বিয়ের মৌসুমের প্রস্তুতি, আর কফিশপগুলোতে বসে থাকা তরুণদের মুখে গল্পের উষ্ণতা।

বাংলার শীতের সবচেয়ে মধুর দিক হলো খাবার। এই সময়েই ঘরে ঘরে পিঠা-পায়েসের আয়োজন। উঠোনে মা-মেয়েরা একসঙ্গে বসে ভাপা পিঠা বানায়, পাশে ধোঁয়া ওঠা দুধের হাঁড়ি।
চিতই, পাটিসাপটা, দুধপুলি, নকশি পিঠা—সব পিঠাতেই আছে ঐতিহ্যের ছোঁয়া। শহরের পিঠার দোকানগুলোও এখন ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে।
গ্রামের মাটির হাঁড়িতে জমানো খেজুরের রস, পিঠার সঙ্গে দুধের মিষ্টি ঘ্রাণ—সব মিলিয়ে শীতের স্বাদ যেন বাংলার সবচেয়ে প্রিয় রন্ধনঋতু।
ফুটপাথের চায়ের দোকানে এখন “গরম চা আর ভাজা বাদাম”-এর গন্ধই যেন আনন্দের নতুন সংজ্ঞা।
শীত মানেই উৎসব। একদিকে বিয়ের মৌসুম, অন্যদিকে বছরের শেষ প্রান্তে ক্রিসমাস ও নতুন বছরের প্রস্তুতি। স্কুল-কলেজে পিকনিক, বইমেলার আগাম উত্তেজনা, আর অফিসের বার্ষিক ট্যুর—সব মিলিয়ে এই ঋতুই সবচেয়ে প্রাণবন্ত সময়।
বাংলার মেলায় এখন জমে ওঠে নাগরদোলা, পিঠার দোকান, নকশি চাদরের বিক্রেতা। আবার শহরে জমে ওঠে বড়দিনের সাজসজ্জা, উপহার বিনিময়ের আনন্দ, ক্যারলের গান।
শীত শুধু আবহাওয়ার পরিবর্তন নয়, এটি মানুষের মনকেও করে কোমল। কেউ উষ্ণ কম্বলের নিচে ঘুম খোঁজে, কেউ সকালবেলায় হাঁটে শিশিরভেজা ঘাসের ওপর দিয়ে, কেউবা সন্ধ্যায় জানালার পাশে বসে এক কাপ কফিতে ডুবে যায় স্মৃতিতে।
প্রেমিক-প্রেমিকারা এখন বেশি হাঁটে হাত ধরাধরি করে, বইপ্রেমীরা মেলায় নতুন বইয়ের অপেক্ষায়, আর বৃদ্ধরা সন্ধ্যার আগুনে পায় পুরোনো দিনের গল্পের উষ্ণতা।
“শীত মানেই শুধু ঠান্ডা নয়—এটি এক উষ্ণ ঋতু, যেখানে মানুষ একটু বেশি কাছে আসে, কথায় মিশে থাকে ভালোবাসা।”

শীত এলে বাংলার প্রকৃতি যেন নতুন করে সেজে ওঠে। গাছের পাতায় শিশির ঝুলে থাকে মুক্তার মতো, নদীর ধারে কুয়াশা ভেসে বেড়ায়, আকাশ নীল থেকে ধূসর হয়ে যায়। মাঠে দেখা মেলে মৌসুমি পাখিদের, বিশেষ করে চাতক, ঘুঘু আর দোয়েল।
দক্ষিণের বাতাসে ঠান্ডা ভাব, তবে সেই ঠান্ডা স্নিগ্ধ, প্রশান্ত। বিকেলের রোদে বসে থাকতে ইচ্ছে করে, চায়ের কাপে ডুবে যেতে ইচ্ছে করে।
বাংলার ঋতুচক্রে শীত এক শান্ত সৌন্দর্যের প্রতীক। গ্রীষ্মের প্রখরতা আর বর্ষার স্যাঁতস্যাঁতে দিন পেরিয়ে শীত আসে এক ধীর প্রশান্তি নিয়ে। এটি শুধু পোশাকের পরিবর্তন নয়, মানুষের মানসিক অবস্থারও এক নবজাগরণ।
এই ঋতু শেখায় মানুষকে ধীরে চলতে, প্রকৃতিকে অনুভব করতে, জীবনের ছোট ছোট সুখে মেতে থাকতে।
কুয়াশার ভেতর দিয়ে যখন সূর্যের আলো ভেসে আসে, মনে হয়—প্রতিটি দিনই নতুন করে শুরু হতে পারে।