নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি
নারায়ণগঞ্জ ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ঘটে যাওয়া একের পর এক সহিংস ও চাঞ্চল্যকর ঘটনায় পুরো জেলা যেন আতঙ্কের নগরীতে পরিণত হয়। খুন, নারী হত্যাকাণ্ড, পুলিশের হেফাজত থেকে অভিযুক্তকে ছিনিয়ে নিয়ে গণপিটুনি এবং ডাকাত সন্দেহে মারধরের ঘটনায় যখন জননিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে, ঠিক সেই দিনই রূপগঞ্জে সেনাবাহিনীর যৌথ অভিযানে বিপুল পরিমাণ মাদক উদ্ধার ও তিনজন গ্রেপ্তারের ঘটনায় কিছুটা স্বস্তির বার্তাও পেয়েছেন স্থানীয়রা।
দিনের শুরুতেই নগরবাসীকে নাড়িয়ে দেয় একটি হত্যাকাণ্ড। শুক্রবার ভোরে শহরের ফকিরটোলা এলাকায় একটি মসজিদের পাশ থেকে অজ্ঞাত পরিচয়ের এক যুবকের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। স্থানীয়দের ধারণা, রাতের কোনো এক সময়ে তাকে হত্যা করে মরদেহ ফেলে রাখা হয়েছে। তবে নিহতের পরিচয়, হত্যার কারণ ও জড়িতদের বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
পুলিশ জানায়, মরদেহটি ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। পরিচয় শনাক্ত এবং ঘটনার রহস্য উদঘাটনে তদন্ত চলছে।
রূপগঞ্জে গৃহবধূ হত্যা, পরে প্রকাশ্যে গণপিটুনি
ভোরের ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই দুপুরে রূপগঞ্জে ঘটে আরও ভয়াবহ ঘটনা। দুই সন্তানের জননী আমেনা বেগমকে গলা ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে ছুরিকাঘাত করে গুরুতর আহত করেন টাইলস মিস্ত্রি মেহেদী হাসান। পুলিশ ও এলাকাবাসী জানায়, ঘটনাস্থলেই অভিযুক্তকে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করা হয়।
কিন্তু হাসপাতাল থেকে আমেনা বেগমের মৃত্যুর খবর এলাকায় ছড়িয়ে পড়তেই পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়। উত্তেজিত জনতা পুলিশের হেফাজত থেকে হাতকড়া পরা অবস্থায় মেহেদী হাসানকে ছিনিয়ে নেয় এবং প্রকাশ্যে গণপিটুনি দিয়ে তাকে হত্যা করে।
এক ঘটনায় একদিকে একজন গৃহবধূ নিহত, অন্যদিকে পুলিশের হেফাজত থেকে অভিযুক্তকে ছিনিয়ে নিয়ে হত্যার ঘটনা নারায়ণগঞ্জের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
দিনের শেষভাগেও শান্ত হয়নি পরিস্থিতি। রাতে সোনারগাঁয়ের হাইওয়ে সড়কে ডাকাত আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। সাম্প্রতিক সময়ে মহাসড়কে গাড়ি থামিয়ে ডাকাতির ঘটনায় দেশজুড়ে উদ্বেগের প্রেক্ষাপটে স্থানীয়রা ছিলেন সতর্ক অবস্থানে।
শুক্রবার রাতে সন্দেহভাজন কয়েকজনকে আটক করে এলাকাবাসী। সিএনজি চালিয়ে পালানোর সময় সাতজনকে ধরে গণপিটুনি দেওয়া হয়। পরে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আহত অবস্থায় ডাকাত সন্দেহে সাতজনকে উদ্ধার করে নিজেদের হেফাজতে নেয়।
সহিংসতার এই উত্তপ্ত দিনের মধ্যেই রূপগঞ্জে সেনাবাহিনীর যৌথ অভিযানে বড় ধরনের মাদকবিরোধী সাফল্য আসে। শুক্রবার সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত উপজেলার লাভড়াপাড়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে একটি বাড়ি থেকে আনুমানিক দেড় কোটি টাকা মূল্যের মাদক উদ্ধার করা হয়।
উদ্ধারকৃত মাদকের মধ্যে রয়েছে ১৩৫ কেজি গাঁজা, ১০ হাজার পিস ইয়াবা ট্যাবলেট, ২৯০ বোতল ফেন্সিডিল ও ১ হাজার ৩৩১ বোতল ইস্কাব। অভিযানে তিন যুবককে গ্রেপ্তার করা হয়।
গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন—লাভড়াপাড়া এলাকার আমানুল্লাহর ছেলে তানজিদ, একই এলাকার আলাউদ্দিনের ছেলে রিফাত এবং পাড়াগাঁও এলাকার রোকন উদ্দিনের ছেলে রিদুল।
রূপগঞ্জ সেনাক্যাম্পের কোম্পানি কমান্ডার শরিফ রূপগঞ্জ থানায় আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে এই বিপুল পরিমাণ মাদক উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতদের রূপগঞ্জ থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে আইনানুগ ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন।
সেনাবাহিনী জানায়, মাদক নির্মূলে এ ধরনের যৌথ অভিযান অব্যাহত থাকবে।
একই দিনে খুন, নারী হত্যা, গণপিটুনি ও ডাকাত আতঙ্কের ঘটনা নারায়ণগঞ্জে জননিরাপত্তা ও আইনের শাসন নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা ও অপরাধ দমনে ঘাটতিই মানুষকে আইন নিজের হাতে তুলে নিতে উদ্বুদ্ধ করছে।
জেলা পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,
“গণপিটুনি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। প্রতিটি ঘটনার তদন্ত চলছে। যারা আইন নিজের হাতে তুলে নিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
শুক্রবারের ঘটনাবহুল দিন নারায়ণগঞ্জবাসীর সামনে দুটি চিত্রই স্পষ্ট করেছে—একদিকে অপরাধ ও জনরোষের ভয়ংকর বাস্তবতা, অন্যদিকে মাদকবিরোধী অভিযানে রাষ্ট্রীয় শক্তির কার্যকর উপস্থিতি। এই নগরকে নিরাপদ রাখতে হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতার পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা, দ্রুত তদন্ত ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে।