সম্পাদকীয়
আরেকটি বছর শেষের দ্বারপ্রান্তে। ২০২৫ আমাদের সামনে রেখে যাচ্ছে নানা অর্জন, অনিশ্চয়তা ও অমীমাংসিত প্রশ্ন। এই সময়টি কেবল একটি বছরের সমাপ্তি নয়, বরং রাষ্ট্র ও সমাজের আত্মসমালোচনার গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। ঠিক এখানেই দাঁড়িয়ে প্রশ্নটি অনিবার্য—২০২৬ সালে আমরা কেমন বাংলাদেশ চাই?
দীর্ঘদিন ধরেই দেশের রাজনীতি সংকট ও সংঘাতের আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে। নির্বাচন ঘিরে অনাস্থা, রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক অবিশ্বাস এবং রাজপথকেন্দ্রিক উত্তাপ গণতান্ত্রিক চর্চাকে দুর্বল করেছে। ২০২৬ সালে আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে রাজনীতি হবে প্রতিশোধমুক্ত ও প্রতিষ্ঠাননির্ভর। মতভিন্নতা থাকবে, কিন্তু তা সহিংসতায় নয়—সংসদে, আলোচনায় ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তি হবে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো রাজনৈতিক প্রভাবের ঊর্ধ্বে উঠে জনগণের আস্থার জায়গা হয়ে উঠবে—এটাই সময়ের দাবি।
অর্থনীতির ক্ষেত্রেও প্রত্যাশা কম নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থানের সংকট ও জীবনযাত্রার ব্যয় সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। পরিসংখ্যানের উন্নতির চেয়েও জরুরি মানুষের জীবনে স্বস্তি ফেরানো। ২০২৬ সালে আমরা চাই এমন একটি অর্থনীতি, যেখানে বাজারে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত হবে, কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষ তাদের শ্রমের প্রকৃত মূল্য পাবে, আর তরুণ সমাজ ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশায় ভুগবে না। বড় প্রকল্পের পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে সমান গুরুত্ব দেওয়া অপরিহার্য।
রাষ্ট্র ও প্রশাসনের সঙ্গে নাগরিকের সম্পর্কেও পরিবর্তন দরকার। অনেক সময় সেবা পেতে গিয়ে মানুষকে ভোগান্তি ও হয়রানির মুখে পড়তে হয়, যা আস্থার সংকট তৈরি করে। ২০২৬ সালে আমরা চাই সেবামুখী, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসন। যেখানে আইনের প্রয়োগ হবে ন্যায্য, সিদ্ধান্তের ভাষা হবে সহজ ও বোধগম্য, আর দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান থাকবে দৃশ্যমান ও কার্যকর।
সমাজের ভেতরেও প্রয়োজন সহনশীলতার চর্চা। রাজনৈতিক ও মতাদর্শিক বিভাজন সামাজিক বন্ধনকে দুর্বল করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিদ্বেষ ও অসহিষ্ণুতা আরও গভীর হয়েছে। ২০২৬ সালে আমরা চাই এমন একটি সমাজ, যেখানে ভিন্নমত থাকবে, কিন্তু বিদ্বেষ নয়। ধর্মীয় ও সামাজিক সহাবস্থান নিশ্চিত হবে, নারী ও সংখ্যালঘুর নিরাপত্তা প্রশ্নাতীত থাকবে, আর তরুণ প্রজন্ম বেড়ে উঠবে মুক্তচিন্তা ও দায়িত্ববোধ নিয়ে।
গণমাধ্যমের ভূমিকাও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গণমাধ্যম রাষ্ট্রের আয়না। এই আয়নায় যদি চাপ, ভয় বা স্বার্থের ছায়া পড়ে, তাহলে সমাজও সঠিক প্রতিচ্ছবি পায় না। ২০২৬ সালে আমরা চাই চাপমুক্ত, পেশাদার ও দায়বদ্ধ গণমাধ্যম, যেখানে সত্য বলা হবে সাহসের সঙ্গে, সমালোচনা হবে দায়িত্ব নিয়ে, আর তথ্য পরিবেশন হবে যাচাই ও বিশ্বাসযোগ্যতার ভিত্তিতে।
সবশেষে বলা যায়, ২০২৬ আমরা চাই একটি আস্থা ফেরানো বাংলাদেশ। যেখানে রাষ্ট্র নাগরিকের প্রতিপক্ষ নয়, সহযাত্রী হবে। উন্নয়ন মানে শুধু অবকাঠামো নয়—মানবিক মর্যাদা, ন্যায়বিচার ও সামাজিক নিরাপত্তাও সমান গুরুত্ব পাবে। এই প্রত্যাশা বাস্তবায়নের দায় শুধু রাষ্ট্রের নয়; রাজনৈতিক শক্তি, প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক—সবার সম্মিলিত দায়িত্বেই ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের পথরেখা নির্ধারিত হবে।