নিজস্ব প্রতিবেদক | কক্সবাজার
ঘড়ির কাঁটা তখন রাত ১টা ছুঁইছুঁই। কক্সবাজারের লাবনী পয়েন্টে দিনের কোলাহল থেমে গিয়ে নেমে এসেছে এক অদ্ভুত নীরবতা। দূরে সমুদ্রের ঢেউ আছড়ে পড়ার শব্দ, আর তার ফাঁকে ফাঁকে বাতাসে মিশে থাকা শীতল হাওয়া। বিলাসবহুল হোটেলগুলোতে তখন পর্যটকদের ঘুম নেমে আসছে নরম বিছানায়। ঠিক সেই সময়েই সৈকতের এক অন্ধকার কোণে ধরা পড়ে জীবনের আরেক নির্মম বাস্তবতা।
বালুর ওপর ছড়িয়ে রাখা কয়েকটি ছেঁড়া সিমেন্টের বস্তা। তার নিচেই কুঁকড়ে শুয়ে আছে দুটি শিশু। নেই কোনো কম্বল, নেই শীত নিবারণের পোশাক। শরীর জড়িয়ে আছে শীতের কাঁপুনি। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়—তারা একা নয়। শিশুদুটির মাঝখানে নিশ্চিন্তে শুয়ে আছে একটি কুকুর। যেন নিজের সমস্ত উষ্ণতা ঢেলে দিয়ে আগলে রেখেছে তাদের।
এই দৃশ্য একই সঙ্গে মায়াময় ও বেদনাদায়ক। সমাজ যাদের অবহেলার চোখে দেখে, যাদের পরিচয় ‘পথশিশু’—তাদের পাশে দাঁড়িয়েছে এক অবলা প্রাণী। কোনো প্রশ্ন নেই, কোনো বিচার নেই। শুধু নির্ভেজাল সহানুভূতি।
স্থানীয় এক হকার জানান, এই শিশুরা দিনে সৈকত এলাকায় ঘোরাফেরা করে। কেউ কেউ প্লাস্টিক কুড়ায়, কেউ ভিক্ষা করে। রাত নামলেই তারা আশ্রয় নেয় সৈকতের কোনো এক কোণে। নেই নির্দিষ্ট ঠিকানা, নেই নিরাপত্তা। শীত, মশা কিংবা অনিশ্চয়তা—সবই তাদের নিত্যসঙ্গী।
কক্সবাজার প্রতিদিন হাজারো পর্যটকের আনন্দ, ছবি আর স্মৃতির শহর। এই শহরকে ঘিরে গড়ে উঠেছে কোটি টাকার পর্যটন শিল্প। অথচ এই আলোর শহরের নিচেই লুকিয়ে আছে এমন অন্ধকার গল্প, যা খুব কম মানুষই দেখতে চায়। লাবনী বিচের এই নিস্তব্ধ রাত প্রশ্ন তোলে—উন্নয়ন কি শুধু ইট-পাথরের, নাকি মানুষের জীবনেও তার ছোঁয়া লাগার কথা?
ভোর হলে আবার সৈকতে ফিরবে কোলাহল। পর্যটকদের ভিড়ে হারিয়ে যাবে শিশুগুলো। কুকুরটি হয়তো চলে যাবে খাবারের খোঁজে। কিন্তু রাত ১টার এই দৃশ্য মনে করিয়ে দেয়—মানুষ যেখানে দায়িত্ব এড়ায়, সেখানে কখনো কখনো একটি প্রাণীই হয়ে ওঠে সবচেয়ে মানবিক আশ্রয়।